মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধর্ম

কোরআনের দৃষ্টিতে খাদ্যে ভেজাল মেশানো

খাদ্যে ভেজাল কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। শিশুখাদ্যে ভেজাল সর্বনাশ করে গোটা একটি প্রজন্মের শরীর, জীবনীশক্তি, মেধা ও আয়ুর।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভেজাল এবং এক বা একাধিক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খেলে মানুষের বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি ও স্মরণশক্তি হ্রাস পায়। মানুষ মেধাহীন হয়ে পড়ে। শরীরের জিনজাত স্নায়ুকোষগুলোর আয়ুও এসব ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খাওয়ার ফলে কমে যায়। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, স্বাদ গ্রহণের শক্তি, ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা রোগ-ব্যাধি। ইসলামে পণ্যে ভেজাল প্রদান সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ মর্মে কোরআনের দলিল নিম্নে আলোচিত হলো—

১. মহান আল্লাহ বলেন, ‘শৃঙ্খলা স্থাপনের পর তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

উক্ত আয়াতে সাধারণভাবে সব ফ্যাসাদ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

(তাফসিরে কুরতুবি : ৭/২২৬)

তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বা পণ্যে ভেজাল প্রদান অন্যতম।

২. আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে ফিরে যায় (অথবা নেতৃত্বে আসীন হয়), তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্য ও প্রাণী বিনাশের চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২০৫)

উক্ত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম রূপ হলো, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। যার প্রভাব তাদের জীবন, সন্তান-সন্ততি, ফল-ফসল ও গবাদি পশুর ওপর গিয়ে পড়ে।

এসব খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদানের ফলে ঘটে থাকে।
৩. মহান আল্লাহ বলেন, ‘ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

এ আয়াতে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, যেভাবেই তা হোক না কেন। আর খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদান ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বিধায় তা হারাম।

৪. মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না এবং অন্যের সম্পদ গর্হিত পন্থায় গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তোমরা জেনেশুনে তা বিচারকদের কাছে পেশ কোরো না।’

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)

আয়াতটি দুদিক থেকে খাদ্যে ভেজাল প্রদান হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে—

ক. অন্যায়ভাবে যেকোনো পন্থায় মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করতে আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে খাদ্যে ভেজাল অন্যতম।

খ. ক্রেতা নির্ভেজাল ও নিরাপদ পণ্য ক্রয় এবং এর দ্বারা পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ মূল্য প্রদান করে। যদি পণ্যে ভেজাল থাকে তাহলে কখনো কখনো তা মূল্য কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এভাবে ভেজাল প্রদানের ফলে পণ্যের মূল্য যতটুকু কম হবে ততটুকু বিক্রেতা ক্রেতার মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে।

৫. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ছাড়া।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এ আয়াতও দুদিক থেকে উক্ত আয়াতটি ভেজাল হারাম হওয়ার দলিল বহন করে—

ক. যেকোনো পন্থায় অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করা। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর অন্যতম মাধ্যম।

খ. ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সম্মতি। এমনকি কিছুসংখ্যক মালেকি বিদ্বান একে প্রথম রুকন হিসাবে গণ্য করেছেন। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে পণ্য ক্রয়কারী ভেজাল ছাড়াই তা ক্রয় করতে সম্মত হয়। কেননা ভেজালে প্রতারণা ও ক্ষতি রয়েছে। তাই কোনো পণ্যে ভেজাল পরিদৃষ্ট হলে তা সম্মতিকে নষ্ট করে দেয়। অতএব প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৬. আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা (অবাধ্যতার মাধ্যমে) আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খিয়ানত কোরো না এবং (এর অনিষ্টকারিতা) জেনেশুনে তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহে খিয়ানত কোরো না।’

(সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)

যা কিছু মানুষ অন্যকে আদায় করে সে বিষয়ে আমানতের খিয়ানত হারাম হওয়ার ব্যাপারে আয়াতটি আম বা ব্যাপক। (তাফসিরে কুরতুবি)

তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্যও রয়েছে। আর মানুষ পণ্যের গুণাগুণ, কার্যকারিতা, মাপ ও ওজন প্রভৃতি বিষয়ে কাউকে বিশ্বস্ত মনে না করলে তার কাছ থেকে তা ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হতে চাইবে না। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর বিপরীত। কাজেই প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৭. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

আল্লাহ তাআলা সর্বাবস্থায় এবং সব কথা ও কাজে সত্যবাদিতা অবলম্বন করাকে আবশ্যক করেছেন। এটি এসব বিষয়ে মিথ্যা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে। পণ্যে ভেজাল প্রদানও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ভেজাল জিনিস বাজারজাত করা হয়। এতে ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে চড়ামূল্য হাতিয়ে নেওয়া হয়।

৮. আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’

(সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৩)

উক্ত আয়াতগুলো পণ্য আদান-প্রদানের সময় সঠিকভাবে তা মাপা ও ওজন করা আবশ্যক হওয়া এবং মাপে ও ওজনে কম দেওয়া হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে। কারণ তা প্রতারণা।

ক্যাটাগরি