শৈশবে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় থাকে মা-বাবা। দিনের ছোট-বড় সব ঘটনা, আনন্দ কিংবা দুঃখ—সবকিছুই তারা পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। তারা নিজের ঘরে বেশি সময় কাটায়, বন্ধুদের অগ্রাধিকার দেয়, ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখতে শুরু করে এবং পরিবারের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটাতে চায় না। এতে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবেন, সন্তান কি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালে এমন পরিবর্তন অনেকটাই স্বাভাবিক। এই সময় একজন কিশোর বা কিশোরী নিজের পরিচয়, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পরিসর গড়ে তুলতে চায়। তবে পারিবারিক কিছু আচরণ ও পরিবেশ এই স্বাভাবিক দূরত্বকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শাসন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং সন্তানের ব্যক্তিগত জীবনে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ তার মনে চাপ তৈরি করে। অনেক মা-বাবা সন্তানের ভালো চাইলেও প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে চান কিংবা গোপনে মোবাইল, ব্যাগ বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি করেন। এতে সন্তানের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং সে ধীরে ধীরে পরিবার থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে পারে।

অন্যের সঙ্গে তুলনা করাও সন্তানের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত হানে। ‘পাশের বাসার ছেলে এত ভালো ফল করে’, কিংবা ‘তুমি ওর মতো হতে পারো না?’—এ ধরনের মন্তব্য সন্তানের মনে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে। সে তখন নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করে চুপচাপ থাকতে শুরু করে।

পারিবারিক অশান্তিও সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ানোর অন্যতম কারণ। বাবা-মায়ের ঘন ঘন ঝগড়া, মতবিরোধ বা অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। অনেক সময় তারা মনে করে, নিজের সমস্যার কথা বললেও কেউ গুরুত্ব দেবে না। ফলে তারা নিজের জগতে গুটিয়ে যায়।

কৈশোরে বন্ধুদের গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এই বয়সে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো বা তাদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া স্বাভাবিক আচরণ। তবে যদি সন্তান পুরোপুরি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার উদ্বেগ, সম্পর্কের জটিলতা, ব্যর্থতার হতাশা কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণেও সন্তানের আচরণ বদলে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি বা অনলাইন আসক্তিও পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। তাই আচরণের হঠাৎ পরিবর্তনকে অবহেলা না করে এর পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। প্রতিদিন কিছুটা সময় শুধু তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রাখুন। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, মতামতকে গুরুত্ব দিন এবং ভুল করলে অপমান না করে বোঝানোর চেষ্টা করুন। সন্তান যেন মনে করে, যেকোনো সমস্যায় সে সবচেয়ে আগে মা-বাবার কাছেই আসতে পারে।

পরিবারের সবাই মিলে সময় কাটানোও সম্পর্ককে দৃঢ় করে। সপ্তাহে অন্তত একদিন একসঙ্গে খাওয়া, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা কিংবা ছোট কোনো পারিবারিক আয়োজন সন্তানের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করা এবং বন্ধুদের সম্পর্কে অযথা নেতিবাচক মন্তব্য না করাও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু মা-বাবার নয়, সন্তানেরও দায়িত্ব রয়েছে পরিবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, মানসিক চাপ বা সমস্যাগুলো অন্তত একজন অভিভাবকের সঙ্গে ভাগাভাগি করলে অনেক সংকট সহজেই সমাধান করা সম্ভব। কারণ বন্ধু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও কঠিন সময়ে সবচেয়ে বড় ভরসা থাকে পরিবার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই দূরত্ব যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, সন্তান একেবারে গুটিয়ে যায়, আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন আসে বা মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর রাখার মূল চাবিকাঠি হলো বিশ্বাস, সম্মান, ধৈর্য এবং খোলামেলা যোগাযোগ। অভিযোগ, ভয় বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়—বরং আন্তরিক কথোপকথন ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই পরিবারকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।

এফ বার্তা /এইচ