আধুনিক জীবনে নানা কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক অশান্তি বাড়ছে। পবিত্র কোরআন শুধু ইবাদতের নির্দেশনাই দেয় না, দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের সময় কীভাবে নিজেকে সামলে রাখতে হবে, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ঈমান, তাকদিরে বিশ্বাস, ধৈর্য, সৎকর্ম ও আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি লাভের কথা বলা হয়েছে।
১. আল্লাহর ওপর ঈমান ও সৎকর্ম
মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ বলেন, যারা তাঁর হেদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত ৩৮)
আরেক আয়াতে ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্য বলা হয়েছে, তাদের কোনো ভয় ও দুঃখ থাকবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত ৬২)
২. তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা
জীবনে সবকিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সুখ-দুঃখ, পাওয়া-না পাওয়া এবং বিভিন্ন বিপদ আল্লাহর জ্ঞাত ও নির্ধারিত—এই বিশ্বাস মানুষকে অতিরিক্ত হতাশা থেকে রক্ষা করতে পারে।
সুরা হাদিদের ২২-২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পৃথিবী বা মানুষের ওপর কোনো বিপদ আসার আগেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন হারানো বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত শোকাহত না হয় এবং পাওয়া বিষয়ে অহংকারে মত্ত না হয়।
৩. তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির চেষ্টা
পাপ, অন্যায় ও অনৈতিকতা থেকে নিজেকে দূরে রেখে চরিত্র ও কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করাও অন্তরের প্রশান্তির একটি পথ। আল্লাহর ভয় ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সুরা আরাফ, আয়াত ৩৫)
৪. মানুষের কল্যাণে কাজ করা
শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে ব্যস্ত না থেকে অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করাও মানসিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কোরআনে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার পাশাপাশি সৎকর্মের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুরা ফুসসিলাতের ৩০ নম্বর আয়াতে ঈমানের ওপর অবিচল ব্যক্তিদের জন্য ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে আশ্বাসের কথা বলা হয়েছে—‘ভয় পেয়ো না, দুঃখও কোরো না।’
৫. নিজের দুঃখ আল্লাহর কাছে তুলে ধরা
দুঃখ-কষ্টের সময় আল্লাহর কাছে নিজের অসহায়ত্ব ও বেদনা প্রকাশ করা মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নবী ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদের গভীর কষ্টে বলেছিলেন, তিনি তাঁর দুঃখ ও বেদনা শুধু আল্লাহর কাছেই নিবেদন করেন। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৮৬)
এ আয়াত বিপদের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া ও ফরিয়াদ করার গুরুত্ব তুলে ধরে।
৬. ভালো পরিণতির আশায় ধৈর্য ধরা
কঠিন পরিস্থিতি সবসময় একই রকম থাকে না। উহুদের যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতেও মুসলমানদের ধৈর্য ধরতে এবং অতিরিক্ত শোক না করতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
সুরা আলে ইমরানের ১৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এক দুঃখের পর আরেক দুঃখ এসেছিল, যাতে মানুষ হারানো বিষয় বা বিপদের কারণে অতিরিক্ত শোকাহত না হয়।
৭. নেককার মানুষের সঙ্গ নেওয়া
কঠিন সময়ে ভালো ও ঈমানদার মানুষের সঙ্গ মানসিক শক্তি বাড়াতে পারে। একজন সৎ সঙ্গী হতাশার পরিবর্তে আশা এবং দুর্বলতার পরিবর্তে সাহস জোগাতে পারেন।
হিজরতের সময় গুহায় অবস্থানের প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘দুঃখ করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত ৪০)
৮. প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা
কোরআনে মারইয়াম (আ.)-এর কঠিন সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। সন্তান প্রসবের কষ্ট ও মানসিক চাপের মধ্যে তাঁকে একটি ঝরনার পানি পান করতে এবং খেজুরগাছ নাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। (সুরা মারইয়াম, আয়াত ২৪-২৬)
এ ঘটনায় কঠিন সময়েও খাবার, পানি, বিশ্রাম ও প্রকৃতির সান্নিধ্যের মতো বাস্তব উপায়ের প্রতি একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কষ্টের সময় আশা হারানো নয়
কোরআনের এসব নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, দুঃখ-কষ্ট মানুষের জীবনের অংশ হলেও তা চিরস্থায়ী নয়। ঈমান, তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস, ধৈর্য, দোয়া, জিকির, সৎকর্ম এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরে আশা ও প্রশান্তি জাগাতে পারে।

