ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই বক্তব্যের মূল ভিত্তি ছিল ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে পরিচালিত কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও শরীয়াহ পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের তিনটি প্রধান দিক ছিল—প্রথমত, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে প্রচলিত ব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে সুদমুক্ত নয়; দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো নিজেকে বিনিয়োগকারী দাবি করলেও প্রকৃত বিনিয়োগের ঝুঁকি গ্রহণে তারা অনাগ্রহী; এবং তৃতীয়ত, কাগজে-কলমে কেনাবেচার আড়ালে এটি অনেকটা সুদভিত্তিক ঋণের মতোই কাজ করছে।
আইনমন্ত্রী তাঁর যুক্তির সমর্থনে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক মামলার রায়ের উদাহরণ টেনেছেন। ১৯৯১ সালের ১৪ নভেম্বর পাকিস্তানের ফেডারেল শরীয়ত আদালত বিভিন্ন আইনের সুদসংক্রান্ত বিধানকে শরীয়াহবিরোধী বলে রায় দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের চার সদস্যের শরীয়ত আপিল বেঞ্চ সেই মূল সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। তবে ২০০২ সালের ২৪ জুন এক পুনর্বিবেচনা আবেদনে আপিল বেঞ্চ আগের রায়গুলো রদ করে মামলাগুলো নতুন করে নিষ্পত্তির জন্য ফেডারেল শরীয়ত আদালতে ফেরত পাঠান। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল ফেডারেল শরীয়ত আদালত পাকিস্তানের অর্থনীতি থেকে সুদ বা রিবা সম্পূর্ণ বিলোপের জন্য ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন। ২০২৪ সালের ২৬তম সংবিধান সংশোধনীতে অনুচ্ছেদ ৩৮(ফ) সংশোধন করে ১ জানুয়ারি ২০২৮-এর আগে সুদ বিলোপের এই সময়সীমা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিচারপতি উসমানী তাঁর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় মুরাবাহা পদ্ধতির ওপর অতিনির্ভরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। মুরাবাহা মূলত একটি বিক্রয়চুক্তি, যেখানে ব্যাংক পণ্য কিনে মুনাফা যোগ করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের অস্তিত্ব থাকে না অথবা ব্যাংক পণ্যের মালিকানা ও দখল গ্রহণ করে না। বিচারপতি উসমানী একে এমন এক লেনদেন হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার সঙ্গে সুদভিত্তিক ঋণের পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ১৯৮০ সালে পাকিস্তানের কাউন্সিল অব ইসলামিক আইডিওলজি সতর্ক করেছিল যে, মুরাবাহার নির্বিচার ব্যবহার সুদের দরজাই খুলে দেবে। আইনমন্ত্রীর মতে, বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুরাবাহার এই অপব্যবহার মূল ধারণাকে এক প্রকার তামাশায় পরিণত করেছে।
বিচারপতি উসমানীর রায়ে তৎকালীন পাকিস্তানের ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও উঠে এসেছিল। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, পর্যাপ্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা ছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলো প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে শরীয়াহর শর্তগুলো লঙ্ঘন করছে। এছাড়া, লাভ-লোকসান বণ্টনভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে মুনাফা গোপনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সতর্ক করেছিলেন। এর সমাধান হিসেবে তিনি স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের অধীনে একটি শরীয়াহ বোর্ড গঠন, কঠোর নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রীর তোলা প্রশ্নগুলো নতুন নয়। মুরাবাহা ও দায় সৃষ্টিকারী মাধ্যমগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে, কয়েকটি ইসলামি ব্যাংক থেকে বিনিয়োগের নামে যেভাবে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা বিচারপতি উসমানীর বর্ণিত ‘কাগজে-কলমে’ লেনদেনেরই প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেছে, পণ্যের প্রকৃত মালিকানা ও দখলের শর্ত মানা হয়নি, যা আর্থিক খাতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি করেছে। কার্যকর যাচাই-বাছাই থাকলে এই অর্থ লোপাটের ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতো।
ইসলামি অর্থায়নে লোকসান বণ্টন নিয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে, তা নিরসনে কিছু মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। মুশারাকা পদ্ধতিতে ব্যবসার লোকসান মূলধনের অনুপাতে বণ্টিত হলেও, মুরাবাহার ক্ষেত্রে ব্যাংক বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে, অংশীদার হিসেবে নয়। তাই মুরাবাহায় গ্রাহকের ব্যবসায়িক লোকসানের দায় ব্যাংকের ওপর বর্তায় না। তবে ব্যাংকের ঝুঁকি থাকে পণ্যটি গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত। বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের বড় অংশই মুরাবাহা বা সমজাতীয় দায়ভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে অংশীদারি বিনিয়োগের হার অত্যন্ত সীমিত।
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আমানত ও বিনিয়োগ হিসাবের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন, যা মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে এই পার্থক্য অস্পষ্ট থাকায় সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। আইনমন্ত্রীর এই সমালোচনাকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা হিসেবে না দেখে শরীয়াহর শর্তগুলো যথাযথভাবে পরিপালনের তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অনেক প্রবক্তা ও বিশেষজ্ঞও অতীতে একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন, যা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির আরও তথ্য: দ্বিতীয়ত, ইসলামি ব্যাংক অর্থায়নের সময় নিজেকে বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। চাকরির আরও তথ্য: অথচ প্রকৃত বিনিয়োগকারীকে যেখানে মুনাফার পাশাপাশি লোকসানের ঝুঁকিও বহন করতে হয়, সেখানে গ্রাহকের ব্যবসায় লোকসান হলে ইসলামি ব্যাংক তার অংশীদার হয় না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রায়ে তিনটি পৃথক মতামতের একটি লেখেন প্রখ্যাত শরিয়াহবিশেষজ্ঞ বিচারপতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্বের বহু দেশে ইসলামি ব্যাংকের উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি উসমানী ইসলামি ব্যাংকিংকে নিছক তত্ত্ব নয়, প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হিসেবে দেখেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রায়ে উদ্ধৃত তৎকালীন উপাত্ত অনুযায়ী বৈশ্বিক আর্থিক সেবা খাতের তুলনায় ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রচলিত চর্চায় এ মুনাফা বাজারের সুদহারকে মানদণ্ড ধরে নির্ধারিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর অবস্থান ছিল, মুরাবাহা বৈধ; তবে যেহেতু এটি একটি ক্রয়-বিক্রয়, তাই বিক্রয়ের সব শর্ত এতে পূরণ হতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে কোনো পণ্য কিনতে চাইলেই কেবল এটি প্রযোজ্য; ব্যাংককে নিজে বা নিযুক্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে পণ্যটি বাস্তবে কিনে এর মালিকানা এবং প্রকৃত বা গঠনমূলক দখল নিতে হবে; দখলে থাকা অবস্থায় পণ্যের ঝুঁকি বহন করতে হবে।

