মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু এর পরের জীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ এখনো আমাদের হাতে
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই পালাতে পারবে না। ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা—কোনোটিই মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। অথচ দুনিয়ার ব্যস্ততায় মানুষ অনেক সময় এমনভাবে ডুবে যায়, যেন এই জীবনই তার শেষ ঠিকানা। ইসলাম তাই বারবার মৃত্যুকে স্মরণ করতে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; বরং দুনিয়ার জীবনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শেখায়। মৃত্যুকে স্মরণ করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার হলো—
১. গুনাহ থেকে দূরে রাখে
মৃত্যুকে ভুলে গেলে মানুষ অনেক সময় গুনাহকে ছোট করে দেখে। কিন্তু মৃত্যুর কথা মনে থাকলে নিজের প্রতিটি কাজের হিসাবের কথা মনে পড়ে। মিথ্যা বলা, অন্যায় করা, হারাম কাজে জড়ানো কিংবা কারো হক নষ্ট করার আগে মানুষ সতর্ক হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অধিক পরিমাণে মৃত্যুকে স্মরণ করো, যা আনন্দ উপভোগকে বিনষ্ট করে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৭)
মৃত্যুর স্মরণ মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি তৈরি করে এবং একাকী অবস্থাতেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়।
২. আখিরাতের প্রতি মনোযোগ বাড়ায়
মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, তখন তার কাছে আখিরাতের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। নামাজ, রোজা, তাওবা, সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে মূল্যবান মনে করো—বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহিহাইন, হাদিস : ৭৮৪৬)
৩. অহংকার কমিয়ে দেয়
মৃত্যুর সামনে দুনিয়ার সব পরিচয় ও পার্থক্য একসময় শেষ হয়ে যায়। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-দুর্বল—সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার কমিয়ে বিনয়ী হতে সাহায্য করে।
৪. নিজের আমল যাচাইয়ের সুযোগ দেয়
মৃত্যুর কথা মনে রাখলে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কী অর্জন করছি? আমার আমল কতটা শুদ্ধ? কারো হক নষ্ট করেছি কি না? আল্লাহর কাছে তাওবা করার সুযোগ এখনো আছে কি না?
এভাবে মৃত্যুচিন্তা আত্মশুদ্ধির পথ খুলে দেয়। তবে এর উদ্দেশ্য হতাশা সৃষ্টি করা নয়; বরং আল্লাহর রহমতের আশা রেখে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগানো।
৫. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে শেখায়
মৃত্যুর সময় কারো জানা নেই। তাই ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার পরিকল্পনার পাশাপাশি এখনই আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা জরুরি।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের অপেক্ষা কোরো না, আর সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা কোরো না। অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে কাজে লাগাও এবং মৃত্যুর জন্য জীবিতাবস্থায় পাথেয় সংগ্রহ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১৬)
মৃত্যুর পর মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে—এসবের সওয়াব অব্যাহত থাকে। (মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
তাই এখনই প্রস্তুতির সময়
মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ‘পরে’ বলে কোনো সময় নির্ধারিত নেই। আজকের নামাজ, আজকের তাওবা, আজকের ভালো কাজই হয়তো জীবনের শেষ সুযোগ হতে পারে।
মৃত্যুকে স্মরণ করা মানে জীবনকে উপভোগ থেকে বঞ্চিত করা নয়; বরং জীবনকে অর্থবহ করে তোলা। যে মানুষ মৃত্যুর অনিবার্যতা মনে রাখে, সে দুনিয়ার জীবনকে দায়িত্বশীলভাবে কাটানোর পাশাপাশি আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে পারে।

