ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের আকাশপথের প্রবেশদ্বার, অথচ আজ সেটিই বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অনিয়ম ও অরাজকতার প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথে আসা-যাওয়া করেন; কেউ ফিরছেন প্রবাসের দীর্ঘ পরিশ্রম শেষে, কেউ যাচ্ছেন নতুন জীবনের খোঁজে। কিন্তু দেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে যে স্থাপনাটি গর্বের প্রতীক হওয়ার কথা, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।
আমাদের সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে বোঝা যায়, এখানে শৃঙ্খলার কোনো অস্তিত্ব নেই। নোংরা টয়লেট, ভেজা ফ্লোর, ভাঙা চেয়ার, দুর্বল আলো- অর্থাৎ এটি যে কোনো আন্তর্জাতিক গেটওয়ে সেই মান খুঁজে পাওয়া যায় না। লাগেজ বেল্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, কোথাও ঘোষণাবিহীন গেট পরিবর্তন, আবার কোথাও ‘বকশিশ না দিলে’ ব্যাগ আটকে রাখা- এ সবই এখন নিয়মের অংশ। যাত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে দালালচক্র এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, বিমানবন্দরের প্রতিটি কোণে তাদের দৌরাত্ম্য টের পাওয়া যায়।
একটি রাষ্ট্রের বিমানবন্দর তার সেবার মান ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা, সংস্কৃতি ও নাগরিক মর্যাদার প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) যাত্রীসেবার উন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা বললেও তা মাঠপর্যায়ে প্রতিফলিত হয় না।
কাস্টমসের নামে যে হয়রানি চলছে, তা আরও লজ্জার। আইন অনুযায়ী, মাত্র ৫ শতাংশ লাগেজ তল্লাশি করার কথা; কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায় নির্বিচার তল্লাশি ও অযথা ঝামেলা সৃষ্টির ফাঁদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। রেমিট্যান্সযোদ্ধারা নিজের দেশে এসে প্রথমেই চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন। নানামুখী প্রশ্ন, তল্লাশি ও ঘুষ দাবির ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। নিয়মমাফিক ফি দেওয়ার পরও অনেকে বাধ্য হন আলাদা ‘বকশিশ’ দিতে। বাধ্যতামূলক এই বকশিশে সম্মত না হলে হয়রানি পোহাতে হয়।আবার বিমানবন্দরের বাইরেও একই চিত্র। দালালচক্র প্রবাসফেরত যাত্রীদের ঘিরে ধরে টাকা দাবি করে। পুলিশের চোখের সামনেই চলে এই অনিয়ম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নয়, এর জন্য দায়ী কর্তব্যরতদের হীন মানসিকতা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। বিমানবন্দর পরিচালনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ইউনিট- ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, নিরাপত্তা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে সমন্বিত কমান্ড সিস্টেম চালু করতে হবে।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য রোধ করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। যাত্রীসেবা ও দায়িত্বরতদের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আচরণবিধি ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা উচিত। একজন নিরাপত্তাকর্মীর কথা ও আচরণের মাধ্যমেই বিদেশি যাত্রীরা প্রথমে বাংলাদেশকে দেখতে পান; তাই তার মধ্য দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে প্রকাশ পায়।
বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা নিশ্চিতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। এ ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। বিমানবন্দর পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের লাল ফিতা ও দুর্নীতির রাহুমুক্ত রাখতে হবে। যাত্রীসেবাকে অগ্রাধিকার রেখে পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার। এটা যদি বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও অপমানের প্রতীক হয়ে থাকে, তবে তা শুধু ভুক্তভোগী যাত্রীর নয়, পুরো জাতির জন্যই লজ্জার। শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে শাহজালাল বিমানবন্দরকে সত্যিকার অর্থে দেশের গর্বে পরিণত করাই লক্ষ্য।

