ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এক গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটে ফেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের তিনটি মূল স্তম্ভকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে, যার ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ওয়াশিংটনের প্রধান পরামর্শদাতা এবং মার্কিন রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে দাবি করা নেতানিয়াহু এবার তার প্রধান মিত্রের দ্বারাই দৃশ্যত একঘরে ও প্রকাশ্যে অপদস্থ হয়েছেন। বিশেষ করে, বৈরুতে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ট্রাম্পের মতে, এই হামলায় নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি।
আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই চুক্তি নেতানিয়াহুর ‘নিরাপত্তার দূত’ ভাবমূর্তিকে চরম বিতর্কের মুখে ফেলেছে।মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইনের মতে, লেবাননে কী ঘটবে তা ইরানকে সিদ্ধান্ত নিতে দিয়ে মূলত হিজবুল্লাহকে সেখানে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহল কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
নেতানিয়াহুর সামনে এখন কোনো সহজ বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ। নেসেটে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আমাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় সবচেয়ে বড় মিত্র আমেরিকার সাথে সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত, অথবা ইসরায়েলি স্বার্থের বশ্যতামূলক আত্মসমর্পণ। চাপ আসছে নেতানিয়াহুর নিজের ক্ষমতাসীন জোটের ভেতর থেকেও।
ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি মানতে আমরা বাধ্য নই। আমরা এই চুক্তির অংশীজন নই, যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’ লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য অ্যারিয়েল কালনার বিবিসিকে বলেছেন, ‘ইসরায়েল নিজেকে সুরক্ষিত করে যাবে।’ তবে এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখবে তা বোঝানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেননি।
সার্বিক এই সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত যেকোনো পরিস্থিতিতে জয় দাবি করতে তৎপর থাকা নেতানিয়াহুর এই নীরবতা মূলত পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে তার চরম অসহায়ত্ব ও দ্বিধাদ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। ইরানে শাসন পরিবর্তন হলে হয়তো তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সহজ হতো।
ইসরায়েল হায়োম নামের একটি পত্রিকায় ড্যানি সিট্রিনোভিচ লিখেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনে চুক্তি ভন্ডুলের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কংগ্রেস ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সমর্থন আদায় করে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন সেই সুযোগ তাঁর নেই বললেই চলে।

