শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ মানুষকে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।” (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)

শয়তানের শত্রুতার সূচনা

শয়তানের এ শত্রুতা আজকের নয়; মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই এর শুরু। মহান আল্লাহ যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদা করার নির্দেশ দেন, তখন ইবলিস অহংকারবশত সেই নির্দেশ অমান্য করে। (সুরা সাদ, আয়াত: ৭১-৭৪)

এরপর সে আল্লাহর কাছে ঘোষণা করে, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ছাড়া।” (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৮২-৮৩)

এ থেকেই বোঝা যায়, শয়তানের প্রধান লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করা। তবে যারা ঈমান, তাকওয়া, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে অটল থাকে, তাদের ওপর শয়তানের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।

যেসব মানুষের সহচর হয়ে যায় শয়তান

১. আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তি

আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রহমানের জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে হয় তার সহচর।” (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৩৬)

আল্লাহর স্মরণ শুধু তাসবিহ পাঠ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিধান অনুসরণ করাই প্রকৃত জিকির। যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন শয়তান তার চিন্তা ও কর্মে প্রভাব বিস্তার করে।

২. যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে না

আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৭)

আরও ইরশাদ হয়েছে, যারা কুফরি করে, তাদের বন্ধু হলো তাগুত; তারা তাদের আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।” (সুরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৭)

এছাড়া সুরা নিসা (আয়াত: ৩৮)-এ বলা হয়েছে, যাদের সহচর শয়তান, সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী!”

৩. লোক-দেখানো দানকারী

ইসলামে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে দান-সদকা করে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, আর যারা লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে… আর শয়তান যার সহচর হয়, সে কতই না নিকৃষ্ট সহচর। (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৮)

৪. অপব্যয়কারী

অপচয় ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন,

অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ২৬-২৭)

এখানে অপব্যয়কারীদের শুধু শয়তানের বন্ধু নয়, বরং ভাই বলা হয়েছে, যা বিষয়টির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

৫. মুনাফিক

যারা মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফরি লালন করে এবং মুসলমানদের ক্ষতি করতে চায়, তারা শয়তানের পথ অনুসরণ করে। আল্লাহ বলেন,

তারা যখন তাদের শয়তানদের সঙ্গে নির্জনে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।” (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪)

৬. পাপে অভ্যস্ত ব্যক্তি

বারবার গুনাহ করতে করতে মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তখন শয়তান তার কাছে পাপকেই সুন্দর করে তুলে ধরে। আল্লাহ বলেন,

আমরা তাদের জন্য কিছু সহচর (শয়তান) নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের অতীত ও ভবিষ্যৎকে তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২৫)

শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায়

ইসলাম শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার কয়েকটি কার্যকর উপায় শিক্ষা দিয়েছে—

  • নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ অনুধাবন করা।
  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকির করা।
  • আল্লাহর কাছে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
  • অহংকার, অপচয়, রিয়া (লোক দেখানো), মিথ্যা ও সব ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকা।
  • সৎ মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ এবং খারাপ পরিবেশ ও কুসঙ্গ পরিহার করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শয়তান মানুষের শরীরে রক্তপ্রবাহের মতো প্রবাহিত হয়। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। তাই একজন মুমিনের উচিত সব সময় আল্লাহর স্মরণে থাকা এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

উপসংহার

শয়তান কখনো মানুষের কল্যাণ চায় না; তার একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া। তাই ঈমান, ইবাদত, তাকওয়া, জিকির ও সৎকর্মের মাধ্যমে শয়তানের ধোঁকা থেকে নিজেকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন, ঈমানের ওপর অবিচল রাখুন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।