এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য, দুই মাসেই ঘাটতি ২৯ হাজার কোটি

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে এনবিআরের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। তবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। স্বাধীনতার পর দেশে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কখনো ২৭ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় করা হলেও সাম্প্রতিক আদায়ের প্রবণতা খুব শক্তিশালী নয়। এনবিআরের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় কমেছে। আগস্টেও ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
জুলাই ও আগস্ট—অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে।
আগের অর্থবছরেও পূরণ হয়নি লক্ষ্যমাত্রা
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি সরকার। অর্থমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছিল।
বাড়ছে সরকারের ব্যয়ের চাপ
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ের চাপও বাড়ছে। একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশনে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি খাতে লোকসান ও ভর্তুকির চাপ রয়েছে। এর সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের অর্থ জোগানোর বিষয়টিও রয়েছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। সরকারের ব্যয়ের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে আয় বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি রয়েছে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও কাটেনি।
তিনি বলেন, সামনে আরও কঠিন অর্থনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতি এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। এ পরিস্থিতি আরও কত সময় দীর্ঘায়িত হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, সরকারের সর্বস্তরের ব্যয়ে আরও সংযম প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। তবে এর ফলে যে চাপ তৈরি হবে, তা মোকাবিলায়ও কৌশল নিতে হবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এর ফলে যাতে মূল্যস্ফীতি বেশি না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হলেও কর প্রশাসনের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তার মতে, নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করের আওতার বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কর প্রদান সহজ করা এবং রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে করের চাপ তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।



