জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার বিপ্লবে দেশের তৎকালীন রাজনীতির গতিধারা পাল্টে গিয়েছিল। দেশ ও জাতি পেয়েছিল নতুন দিশা।
সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করে ভবিষ্যতে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার হরণ এবং বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা প্রতিহত করার বার্তা দিতে চায় বিএনপি।
এবারের দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বাণীতে ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি বিএনপির সেই রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে উঠে এসেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপির কাছে এবারের ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য শুধু অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ঐতিহাসিক দিবসটির চেতনাকে বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকারে রূপ দিতে চায় দলটি।
দীর্ঘ বিরতির পর এবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। উভয় বাণীতেই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী বীর সেনানী ও দেশপ্রেমিক জনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি ৭ নভেম্বরকে জাতীয় জীবনের অবিস্মরণীয় দিন এবং দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ঐক্যবদ্ধ সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে জনগণের সমর্থনে তাঁর ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় সংকট উত্তরণের দায়িত্ব অর্পিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।
ইতিহাসের বাঁকে ৭ নভেম্বর
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বন্দি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। চার দিন পর ৭ নভেম্বর সেনাসদস্যদের বিদ্রোহ ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তি পান।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকাও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন জাসদের গণবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
ওই ঘটনার পর দেশের ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
বিএনপি দিবসটিকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হিসেবে পালন করে। দলটির মতে, ৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষায় জনগণের সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফিরেছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস
দীর্ঘ বিরতির পর এবার সরকারি ছুটি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দিবসটির সরকারি ছুটি চালু ও বাতিল করা হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময় ছুটি পুনর্বহাল হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাতিল করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি।
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সরকারি ছুটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে এবারের আয়োজন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে।
সাত দিনব্যাপী বিএনপির কর্মসূচি
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ শনিবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কী বলছেন বিএনপির নেতারা
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণমাধ্যমকে বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বকীয়তা এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশি পরিচয় মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে বিএনপি মনে করে। সেই পরিস্থিতি প্রতিহত করতে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিল।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সমর্থনে জিয়াউর রহমান সেনানিবাস থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় সেদিন আরও সুস্পষ্ট হয়েছিল।
আলাল আরও বলেন, অতীতে বাংলাদেশে যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং প্রতারণার পরিস্থিতি এড়াতে জাতিকে সচেতন রাখতে হবে। এটি বিএনপির দলীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সরকারেরও দায়িত্ব।
তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের চেতনার যোগসূত্র রয়েছে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরাই এবারের দিবসের নতুন রাজনৈতিক বার্তা।



