লাইফস্টাইল

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে দিনে ৪ মিনিটের ব্যায়ামই কি যথেষ্ট? জানাল গবেষণা

ছবি: সংগৃহীত
ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ব্যায়ামের সময় পান না অনেকেই। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষের কাছে প্রতিদিন শরীরচর্চার জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, একটানা দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করেও দিনে মাত্র চার মিনিটের সংক্ষিপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বিভিন্ন সময়ে এক মিনিট করে মোট চারবার তুলনামূলক জোরালো ব্যায়াম করলে খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কমতে পারে। এ ধরনের অল্প সময়ের ব্যায়ামকে বিশেষজ্ঞরা ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকস’ বলে থাকেন।

কীভাবে কাজ করে চার মিনিটের ব্যায়াম?

‘ডায়াবেটোলজিয়া’ (Diabetologia) সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় শরীরের নিজস্ব ওজন ব্যবহার করে করা সংক্ষিপ্ত ব্যায়ামের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন এক মিনিট করে চারবার শারীরিক কার্যকলাপ করতে বলা হয়। এ জন্য তাঁদের ইমেইলের মাধ্যমে ছোট ছোট ব্যায়ামের ভিডিও পাঠানো হয়েছিল। পরে ব্যায়াম করার সময় রক্তে গ্লুকোজের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ব্যায়াম না করার সময়ের প্রতিক্রিয়া তুলনা করেন গবেষকেরা।

ফলাফলে দেখা যায়, দিনের বিভিন্ন সময়ে করা এই সংক্ষিপ্ত ব্যায়াম খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কমাতে এবং দৈনন্দিন গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যায়ামের জন্য একটানা দীর্ঘ সময় বের করতে না পারলেও অল্প সময়ের শারীরিক কার্যকলাপ থেকে উপকার পাওয়া সম্ভব।

ব্যায়াম কীভাবে রক্তে শর্করা কমায়?

শরীরের পেশি সক্রিয় হলে শক্তি উৎপাদনের জন্য রক্ত থেকে গ্লুকোজ গ্রহণ করে। ফলে শারীরিক কার্যকলাপের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা কমতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে। ইনসুলিন এমন একটি হরমোন, যা রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এ কারণে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ টাইপ–২ ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কী এই ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকস’?

এক্সারসাইজ স্ন্যাকস বলতে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প সময়ের জন্য করা শারীরিক ব্যায়ামকে বোঝায়। প্রচলিত শরীরচর্চার মতো একবারে ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টা ব্যায়াম না করে কয়েক মিনিটের ছোট ছোট সেশনে এসব ব্যায়াম করা হয়।

এ ধরনের ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে—

  • দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা।

  • কয়েকবার স্কোয়াট করা।

  • একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মার্চিং করা।

  • দেয়ালে ভর দিয়ে পুশ-আপ করা।

  • শরীরের নিজস্ব ওজন ব্যবহার করে সহজ ব্যায়াম করা।

বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করেন কিংবা নিয়মিত জিমে যাওয়ার সুযোগ পান না, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এই অভ্যাস কার্যকর হতে পারে।

চার মিনিটের ব্যায়াম কি নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প?

গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও দিনে চার মিনিটের ব্যায়ামকে পূর্ণাঙ্গ শরীরচর্চার বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গবেষণাটি মূলত টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সংক্ষিপ্ত ব্যায়ামের প্রভাব নিয়ে করা হয়েছে। তাই দিনে চার মিনিট ব্যায়াম করলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ করা উচিত। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি সুষম খাবার গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি।

ডায়াবেটিস রোগীদের যেসব সতর্কতা প্রয়োজন

যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ চালিয়ে যেতে হবে। ব্যায়াম ওষুধের বিকল্প নয়।

বিশেষ করে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গ্রহণকারীদের ব্যায়ামের সময় রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

এ ছাড়া হৃদ্‌রোগ, স্নায়ুর সমস্যা, পায়ের ক্ষত কিংবা ডায়াবেটিসজনিত অন্য কোনো জটিলতা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ব্যস্ত জীবনেও শরীর সক্রিয় রাখার উপায়

নিয়মিত ব্যায়ামের জন্য দীর্ঘ সময় বের করতে না পারলেও দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট শারীরিক কার্যকলাপের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। যেমন খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটা, দীর্ঘ সময় বসে থাকার মাঝে উঠে দাঁড়ানো কিংবা কয়েক মিনিট সহজ ব্যায়াম করা।

গবেষণার ফলাফল ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে নতুন উৎসাহ দিতে পারে। তবে চার মিনিটের ব্যায়ামকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় মনে করা ঠিক হবে না।

সব মিলিয়ে, সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের ছোট ছোট শারীরিক নড়াচড়াও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার সমন্বয়ই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

ক্যাটাগরি