প্রতিদিন ডিম খেলে কি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে?

সকালের নাশতায় ডিম অনেকেরই পছন্দের খাবার। সহজে তৈরি করা যায়, পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের অন্যতম ভালো উৎস এটি। তবে ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকায় অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, প্রতিদিন ডিম খেলে কি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে? সুস্থ থাকতে দিনে কয়টি ডিম খাওয়া উচিত?
পুষ্টিবিদদের মতে, বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি গোটা ডিম খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী ডিম খাওয়ার পরিমাণে ভিন্নতা থাকতে পারে।
ডিমে রয়েছে যেসব পুষ্টিগুণ
ডিম শুধু প্রোটিনের উৎস নয়, এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম ও কোলিন পাওয়া যায় ডিমে। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া ডিমের কুসুমে রয়েছে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামের দুটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ডিমের সাদা অংশে মূলত উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে কুসুমে রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও চর্বি।
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ?
সবার জন্য ডিম খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন একটি গোটা ডিম খাওয়া সাধারণত ভালো বিকল্প হতে পারে।
যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন কিংবা পেশি গঠনে মনোযোগী, তাঁরা প্রোটিনের চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন। তবে নিয়মিত একাধিক গোটা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।
ডিম খেলে কি রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ে?
ডিমের কুসুমে ডায়েটারি কোলেস্টেরল রয়েছে। তবে খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়।
ডিম খাওয়ার ফলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। বংশগত বৈশিষ্ট্য, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে যাঁদের রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেশি, তাঁদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিমের সাদা অংশ, নাকি কুসুম—কোনটি বেশি উপকারী?
কোলেস্টেরলের ভয়ে অনেকে ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খান। তবে পুষ্টিগুণের দিক থেকে পুরো ডিমেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
ডিমের সাদা অংশে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন। অন্যদিকে কুসুমে পাওয়া যায় কোলিন, ভিটামিন বি১২সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।
যাঁরা প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে চান, কিন্তু কোলেস্টেরল গ্রহণ সীমিত রাখতে চান, তাঁরা একটি গোটা ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত সাদা অংশ খেতে পারেন।
ডিম রান্নার কোন পদ্ধতি বেশি স্বাস্থ্যকর?
ডিম কতটা স্বাস্থ্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে রান্নার পদ্ধতি ও ব্যবহৃত উপকরণের ওপর।
- সেদ্ধ ডিম: বাড়তি তেল বা মাখন ছাড়াই খাওয়া যায়।
- পোচ ডিম: কম তেলে বা তেল ছাড়াই তৈরি করা সম্ভব।
- ভাজা ডিম: অতিরিক্ত তেল ও মাখন ব্যবহার করলে ক্যালরি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেড়ে যায়।
- স্ক্র্যাম্বলড ডিম: অতিরিক্ত পনির ও মাখন ছাড়া তৈরি করলে এটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, ফল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখলে খাবারের পুষ্টিমান ও ভারসাম্য আরও ভালো হয়।
যাঁদের ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ডিম খাওয়ার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন—
- যাঁদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি।
- যাঁদের বংশগতভাবে কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে।
- যাঁরা হৃদ্রোগে আক্রান্ত বা হৃদ্রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
- যাঁদের ডিমে অ্যালার্জি রয়েছে।
- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, যাঁদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ব্যক্তিদের নিয়মিত ডিম খাওয়ার পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা ভালো।
তাহলে প্রতিদিন ডিম খাবেন কি না?
ডিমকে অকারণে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল, মাখন ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার অভ্যাস কমান।
মনে রাখতে হবে, শুধু একটি খাবার নয়, বরং প্রতিদিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা ও শরীর ভালো রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।



