সারাদেশ

অসুস্থ মাকে আশ্রয় দিতে নারাজ ছেলে, ইউএনওর সামনেই আত্মহত্যার হুমকি

ছবি: সংগৃহীত

জীবনের শেষ সময়ে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চান হৃদরোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মুন্নি খাতুন। কিন্তু অসুস্থ মাকে নিজের ঘরে রাখতে ও ভরণপোষণ দিতে নারাজ ছেলে সাগর হোসেন। প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত শুনানিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সামনেই মাকে সঙ্গে রাখতে বাধ্য করা হলে আত্মহত্যার হুমকি দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত সাগর হোসেন উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। তিনি সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে সাগর ও বিবাহিত মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন মুন্নি খাতুন। তবে সাগরের বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে মায়ের ভরণপোষণ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন বৃদ্ধা।

ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ না পেয়ে প্রথমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হন মুন্নি খাতুন। নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেও সমাধান পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।

পরে বাধ্য হয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানির আয়োজন করা হয়। এতে ইউপি চেয়ারম্যান, মুন্নি খাতুন ও তাঁর ছেলে সাগর উপস্থিত ছিলেন।

শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ ছেলেকে আইনি, মানবিক ও নৈতিক দিক বিবেচনা করে অসুস্থ মাকে নিজের ঘরে রাখার আহ্বান জানান। তবে মাকে সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সাগর বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।’

ছেলের এমন অনীহার মধ্যেও মায়ের আকুতি, শেষ জীবনটা যেন সন্তানের ঘরেই কাটাতে পারেন। মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার তো স্বামী নেই, অসুস্থ হার্টের রোগী। এখন ছেলে ছাড়া আমার কে আছে? আমি ছেলের কাছে বাড়তি কোনো টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের ঘরে শেষ জীবনটা কাটাতে পারি, ওটাই আমার শান্তি। সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চাওয়া কি মায়ের অপরাধ?’

মা-ছেলের বিরোধের বিষয়ে নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দূর করতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। তবে ছেলে কোনো সিদ্ধান্তেই রাজি হননি।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ জানান, অভিযোগের বিষয়ে শুনানি নেওয়া হয়েছে। অসুস্থ বৃদ্ধা মা সন্তানের কাছে আশ্রয় ও নিজের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করার জন্য বোঝানো হয়েছে এবং তাঁকে কিছুদিন সময় দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও আরও জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারিবারিক বিরোধের সমাধান না হলে বৃদ্ধা মায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আইনগত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বৃদ্ধা মুন্নি খাতুনের এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে অসহায় মা-বাবার ভরণপোষণ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং বার্ধক্যে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্ন। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বাংলাদেশে এ বিষয়ে আইনও রয়েছে।

ক্যাটাগরি