জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণের প্রশংসা করে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবন থেকে পাঠানো এক বার্তায় রাষ্ট্রপতি এ অভিনন্দন জানান।
অভিনন্দন বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, ফিলিস্তিন, বিশ্বশান্তি, নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
বিশ্বশান্তি ও সংঘাত নিরসনে কূটনীতির আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বে চলমান সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা।
তিনি বলেন, মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান।
এ জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ—এ কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।
অর্থনীতি ও তরুণদের কর্মসংস্থান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে বড় সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা জানান তিনি।
নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা
ভাষণে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। এসব কার্ড সমন্বয় করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষা ও খেলাধুলায় গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও নতুন প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব।
তবে প্রযুক্তির সুযোগ যেন বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিনিয়োগ ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
ভাষণের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার, যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
ফিনান্সিয়াল বার্তা/ এইচ



