সারাদেশ

নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফ হত্যা: স্ত্রী মামলা করেছেন, তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার সাকের আহমেদ। এদিকে ময়নাতদন্তে নিহত সাংবাদিকের শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

এর আগে শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে নেত্রকোনা থেকে তাঁর মরদেহ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, নিহত সাংবাদিকের শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। অন্য একটি গুলি তাঁর পিঠের ভেতরে আটকে ছিল, যা ময়নাতদন্তের সময় বের করা হয়।

চিকিৎসক বলেন, আলিফের বুকের অংশে তিনটি গুলি লাগে। এর মধ্যে দুটি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের দিকে আটকে ছিল। এ ছাড়া একটি গুলি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। আরেকটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে যায়।

ক্ষতের ধরন বিশ্লেষণ করে চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ বলেন, শরীরে গুলির প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আলিফকে সামনে থেকে গুলি করা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্তরাইল এলাকায় তেলনজিয়া গ্রামের একটি চায়ের দোকানের সামনে সাংবাদিক আলিফকে গুলি করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত পোস্ট দিতেন।

দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার সাকের আহমেদ বলেন, ঘটনার পর থেকে জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত এবং আলিফের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন অনিন্দিতা সাংমা। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, এভাবে একজন মানুষকে অল্প সময়ের মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি।

তিনি বলেন, “বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম কেউ হয়তো পটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাঁকে (লুৎফুজ্জামান) মেরে ফেলেছে।”

স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে অনিন্দিতা বলেন, “আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। আমি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি। তবে যারা তাঁকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

স্বজনদের বরাতে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে অনিন্দিতাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। তাঁদের চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে। লুৎফুজ্জামানের পৈতৃক বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। গ্রামটিতে গারো সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি।

লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, ঘটনার সময় তাঁরা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে লুৎফুজ্জামানকে মাটিতে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁরাও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

ঘটনার পর থেকেই হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

 

ক্যাটাগরি