ধর্ম

বৈধ হলেও যেসব ১০ কাজে অতিরিক্ততা নিষেধ করেছে ইসলাম

সংগৃহীত ছবি

ইসলাম জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সংযমের শিক্ষা দেয়। এমন কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলো মূলত বৈধ হলেও অতিরিক্ত করলে মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে অপছন্দনীয় বা নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলমানদের এসব বিষয়ে পরিমিতিবোধ অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন।

হাসি-ঠাট্টা, কথাবার্তা, প্রশ্ন করা, নসিহত, বেচাকেনায় শপথ, বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা খাদ্য গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ততা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা রয়েছে ইসলামে।

১. অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা

হাসা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি বলেন, ‘তোমরা বেশি বেশি হাসবে না। কেননা অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মৃত করে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৯৩)

অতিরিক্ত হাসি মানুষকে আখিরাতের বিষয়ে উদাসীন করে দিতে পারে। আবার মানুষকে হাসানোর প্রবণতা থেকে কখনো মিথ্যা বলারও আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে মিথ্যা বলে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৫)

২. বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ

ব্যবসা-বাণিজ্যে পণ্য বিক্রির জন্য বারবার শপথ করা থেকেও সতর্ক করেছেন নবী (সা.)। তিনি বলেন, ‘তোমরা বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ এটি পণ্য বিক্রি বাড়ায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বরকত নষ্ট করে দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬০৭; নাসাঈ, হাদিস : ৪৪৬০)

অতিরিক্ত শপথ করতে গিয়ে মিথ্যা বলার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে ক্রেতার কাছে বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩. অতিরিক্ত প্রশ্ন করা

অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত প্রশ্ন করাকে অপছন্দনীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেছেন—অযথা ‘এটা বলা হয়েছে, ওটা বলা হয়েছে’ ধরনের কথাবার্তা বলা, সম্পদের অপচয় এবং অতিরিক্ত প্রশ্ন করা।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪১৭)

যে বিষয় মানুষের বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় নয়, যার কোনো উপকার নেই কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অযথা অনুসন্ধান করা—এসব অতিরিক্ত প্রশ্নের মধ্যে পড়তে পারে।

৪. অতিরিক্ত নসিহত করা

নসিহত করা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে সব সময় বা অতিরিক্ত নসিহত করলে মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) আমাদের নির্দিষ্ট কিছু দিনে নসিহত করতেন, যাতে আমরা বিরক্ত না হয়ে যাই।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০)

এ থেকে নসিহতের ক্ষেত্রেও সময়, পরিস্থিতি ও মানুষের মানসিক অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়।

৫. তাওয়াফের সময় অতিরিক্ত কথা বলা

তাওয়াফের সময় কথা বলা বৈধ হলেও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তাওয়াফ হলো নামাজের মতো। অতএব, তোমরা যখন তাওয়াফ করবে, তখন কম কথা বলবে।’ (নাসাঈ, হাদিস : ২৯২২)

তাওয়াফের সময় অতিরিক্ত কথাবার্তা ইবাদতের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। তাই এ সময়ে দোয়া, জিকির ও আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

৬. রাতে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত বাইরে বের হওয়া

রাত গভীর হওয়ার পর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে চলাফেরা কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশনাও হাদিসে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাত গভীর হওয়ার পর তোমরা বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দাও। কারণ আল্লাহ তাআলার কিছু প্রাণী আছে, যেগুলো তিনি পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১০৪)

তাই গভীর রাতে প্রয়োজন ছাড়া বারবার ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

৭. যা শুনবে, সব প্রচার করা

কোনো তথ্য বা সংবাদ শোনার পর যাচাই না করে তা অন্যের কাছে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা কিছু শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম, ভূমিকা; আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)

তাই কোনো খবর বা তথ্য শুনলেই তা প্রচার না করে আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে দিলে মিথ্যা প্রচারের পাশাপাশি মানুষের কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হতে পারে।

৮. বন্ধুকে অতিরিক্ত দেখতে যাওয়া

বন্ধু ও প্রিয়জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ভালো কাজ। তবে অতিরিক্ত সাক্ষাতের কারণে সম্পর্কের মধ্যে একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘বিরতি দিয়ে সাক্ষাৎ করো; এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (মুসনাদ বাজ্জার, হাদিস : ৯৩১৫)

তবে যাদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক, যৌথ দায়িত্ব বা নিয়মিত কাজ রয়েছে, তাদের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। একইভাবে মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম রয়েছে।

৯. স্বাভাবিক সীমার বাইরে ভোগ-ব্যবহার

খাওয়া-পানিসহ জীবনযাপনের বৈধ উপকরণ ব্যবহারে অপচয় ও অতিরিক্ততা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)

অর্থাৎ বৈধ জিনিস ব্যবহার করলেও প্রয়োজন ও সামর্থ্যের সীমা বিবেচনায় রেখে পরিমিত থাকা উচিত।

১০. অতিরিক্ত খাওয়া

অতিরিক্ত পরিমাণে পেট ভরে খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন মহানবী (সা.)। এক ব্যক্তি তাঁর সামনে ঢেকুর তুললে তিনি বলেন, ‘তোমার ঢেকুর আমাদের থেকে দূরে রাখো। কারণ দুনিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি পেট ভরে খায়, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৭৮)

এই হাদিসের মাধ্যমে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ থেকে নিরুৎসাহ করা হয়েছে। অতিভোজন মানুষের শরীর ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে নানা ধরনের অসুবিধা তৈরি করতে পারে এবং ইবাদতের উদ্যমও কমিয়ে দিতে পারে।

ইসলামে পরিমিতিবোধের শিক্ষা

ইসলাম মানুষের জীবনে ভারসাম্য ও সংযমকে গুরুত্ব দিয়েছে। হাসি-ঠাট্টা, কথা বলা, ব্যবসা, প্রশ্ন করা, নসিহত, বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ, ভোগ-ব্যবহার কিংবা খাদ্য গ্রহণ—এসবের কোনোটিই সাধারণভাবে নিষিদ্ধ নয়। তবে বৈধ কোনো কাজও যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তা মানুষের দ্বিন, চরিত্র, সময়, সম্পদ ও অন্তরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই একজন মুসলমানের জন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও সংযম বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ফিনান্সিয়াল বার্তা/ এইচ

ক্যাটাগরি