জাতীয়

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ

ছবি: সংগৃহীত
দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বসবাস করছে বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো যেকোনো ধাক্কায় তাদের আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর দারিদ্র্য ও সমতা পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক শ্লথগতি, দুর্বল শ্রমবাজার ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন বলছে, গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। এ বছরের বিশেষ প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য নিরাপদ আবাসস্থল’। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের জীবনমান ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় উচ্চতর দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এ সময়ে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে। তবে ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমার গতি মন্থর হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ ব্যয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে মন্থরতা শিল্প-কারখানার কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করেছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন বলেন, আয় সীমিত অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেশি হলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সংসারের ব্যয় মেটাতে প্রতিনিয়ত হিসাব করতে হয়। একপর্যায়ে খাবার, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার খরচ কমাতে বাধ্য হয় তারা।

তিনি বলেন, বিশেষ করে পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে কম দামের শর্করাজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়লে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনও। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও লবণাক্ততার কারণে ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকা হারিয়ে অনেক পরিবার নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। এসব এলাকায় নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য কমাতে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করা জরুরি।

অসুস্থতা, কর্মহীনতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো গেলে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর আবার দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এতে দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি মানুষের অর্জিত জীবনমান ধরে রাখাও সহজ হবে।

 

ক্যাটাগরি