সিটি গ্রুপের পাঁচ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে আইন শিথিল করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের একটি ধারা আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেট থেকে নতুন ঋণ নিতে পারবে প্রতিষ্ঠানগুলো।
বুধবার (৪ নভেম্বর) এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সিটি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণসুবিধা দিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক(৩) ধারা আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর না রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
ঋণসুবিধার আওতায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—সিটি সিড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, সিটি ডাল মিলস লিমিটেড ও শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেড।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার যোগ্য নয়। তবে বিশেষ বিবেচনায় সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধারাটি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে তীর ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাতকারী সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার সুযোগ পাবে।
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত
৩ হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ঋণের বিপরীতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আর্থিক দায় তৈরি হবে না। ভবিষ্যতে সিটি ব্যাংক কিংবা সিন্ডিকেটের অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ঋণের কারণে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সিটি গ্রুপকে এমন সম্পত্তি নিবন্ধিত বন্ধক (রেজিস্টার্ড মর্টগেজ) হিসেবে দিতে হবে, যা অন্য কোনো ঋণ বা দায়ের বিপরীতে বন্ধক রাখা নেই।
এ ছাড়া সিন্ডিকেটের ঋণের অর্থ দিয়ে কেনা পণ্য বিক্রির পর পাওয়া অর্থ একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। ওই হিসাব থেকে আনুপাতিক হারে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর পাওনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের ঋণের অর্থে আমদানি করা কাঁচামাল ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণদাতা ব্যাংক কিনবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সিকিউরিটি এজেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে এবং জিম্মাদার হিসেবে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করবে।
সিটি গ্রুপের কাছে ৪৩ ব্যাংকের পাওনা ২৬ হাজার কোটি টাকা
এর আগে গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিটি গ্রুপের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আপাতত খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার পরামর্শ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পাশাপাশি ব্যবসায়িক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে সিটি গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃ তফসিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়। একই সঙ্গে গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখতে নতুন করে মূলধন জোগানের জন্য ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সিটি গ্রুপের কাছে দেশের ৪৩টি ব্যাংকের পাওনা ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বড় অংশ ইতিমধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ওই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ঋণদাতা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নিয়ে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনগত বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংক খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।



