অর্থনীতি

সরবরাহ কমিয়ে সয়াবিন তেলের দাম আরও বাড়ানোর পাঁয়তারা

ছবি: সংগৃহীত

সরকারি দাম বহাল থাকলেও খোলা সয়াবিন ১৯৫ টাকা লিটার; ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ফের অস্থির হয়ে উঠছে দেশের ভোজ্যতেলের বাজার। সয়াবিন তেলের দাম আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে মিলগেট থেকে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার রাজধানীর নয়াবাজারে ছয়টি মুদি দোকান ঘুরে দেখা যায়, চারটি দোকানেই এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে জিনজিরা কাঁচাবাজারের আটটি দোকানের মধ্যে তিনটিতে এক লিটারের বোতলজাত তেল এবং দুটিতে দুই লিটারের তেল পাওয়া গেছে। তবে এসব দোকানে পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ছিল।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় ডিলারদের কাছ থেকে তারা অনেক কম তেল পাচ্ছেন। জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাগর বলেন, এক ও দুই লিটারের সয়াবিন তেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২০ কার্টন হলেও ডিলাররা দিচ্ছেন মাত্র ২ থেকে ৪ কার্টন। তার অভিযোগ, দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৮০ টাকা হলেও বিভিন্ন বাজারে তা প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের চার থেকে পাঁচটি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানি, পরিশোধন ও বাজারজাত করে। তবে বছরের বিভিন্ন সময়ে ডিলারদের মাধ্যমে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে।

তার মতে, সরবরাহ সংকট তৈরি করে সরকারকে মূল্যবৃদ্ধির জন্য চাপের মধ্যে ফেলা হয় এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের কারণ দেখিয়ে গত ১১ জুলাই ভোজ্যতেল লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ১৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৮৮ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৮৩ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে তখন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক হলেও কোনো মীমাংসা হয়নি।

এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীদের দাবির আংশিক বিবেচনায় নিয়ে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের চাওয়া অনুযায়ী দাম না বাড়ায় এখন সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাওরান বাজারের একটি সয়াবিন তেল ব্র্যান্ডের এক ডিলার বলেন, কোম্পানিগুলো আবারও দাম বাড়াতে চাইছে। এজন্য ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি থেকে কম তেল পাওয়ায় খুচরা বাজারেও সরবরাহ কম দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যয় এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় প্রতি লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

তাদের ভাষ্য, এসব কারণে নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করে লোকসান হচ্ছে।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহণ ব্যয় বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার সর্বশেষ দাম সমন্বয় করেছে। ব্যবসায়ীরা লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর দাবি করলেও সরকার ৫ টাকা বাড়িয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই। নতুন করে দাম বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে কোনো চিঠিও দেয়নি। সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফলে নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের নজরদারি কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন ভোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফিনান্সিয়াল বার্তা/ এইচ

ক্যাটাগরি