জাতীয়

তীব্র গ্যাস-জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিং

ছবি: সংগৃহীত

তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে বেড়েছে লোডশেডিং। দিন-রাত সমানতালে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আর ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।

ফলে বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট। এর আগে গত ১০ আগস্ট চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। ওই সময়ে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে সেখান থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্পকারখানায় সরবরাহ বাড়ানোয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

ঢাকাতেও বাড়ছে লোডশেডিং

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস-সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছিল। গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানীতেও লোডশেডিং শুরু হয়।

ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা করলেও গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক এলাকায় এর চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দিনের ব্যস্ত সময় এবং রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় বহুতল ভবনে লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাসাবাড়িতে পানির সংকট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাতের মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও সংকট

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম।

কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারছে কেন্দ্রটি।

তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি ঘাটতি

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি সামাল দিতে উচ্চ ব্যয়ের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট।

সূত্র অনুযায়ী, ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ এবং পিডিবির সঙ্গে চলমান বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।

গ্যাস সরবরাহেও বড় ঘাটতি

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকটও তীব্র হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ১৪৫ কোটি ঘনফুট।

মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। পরে টার্মিনালটি সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

সংকট কাটাতে সংস্কারের দাবি

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তাঁর মতে, এলএনজি আমদানি, জাহাজ ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে।

তিনি বলেন, সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বের হতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার, দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

সব মিলিয়ে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণ একসঙ্গে চলায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল বার্তা/এইচ

ক্যাটাগরি