আন্তর্জাতিক

যেভাবে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া

পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আর কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না’- ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর যখন ট্রাম্প ওয়াশিংটনের শক্তি প্রদর্শন করছেন; চীন ও রাশিয়াও তাদের নিজস্ব প্রভাববলয়কে সুসংহত ও সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই তিনটি দেশই একটি নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যার প্রভাব ইউরোপসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ওপরও পড়তে পারে।

আমরা বিশ্লেষণ করছি— কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, আরও দূরের দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’ এক বিশ্ব

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধকে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান, দুই দল থেকেই নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধারণায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ফুটে ওঠে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাবকে আরও বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়ন, যেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এমন বিষয়গুলোকে, যেমন অভিবাসন, অপরাধ ও মাদক পাচার—যেগুলো সরাসরি আমেরিকান নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সাম্প্রতিক মন্তব্যে বলেছেন, বিশ্ব এখন ‘শক্তি দ্বারা শাসিত, প্রভাব দ্বারা শাসিত, ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’—যা ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে হেনরি কিসিঞ্জার ও রিচার্ড নিক্সনের বাস্তববাদী, আদর্শহীন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তুলনার অবকাশ তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে সবচেয়ে মিল হতে পারে বিংশ শতকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ও থিওডোর রুজভেল্টের আমেরিকান সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের নীতি।

৮২৩ সালের ‘মনরো নীতি’, যা ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে পশ্চিম গোলার্ধকে মুক্ত রাখার কথা বলেছিল—তার ভিত্তিতে রুজভেল্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো আমেরিকা মহাদেশে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও ডোমিনিকান রিপাবলিকের মতো দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল এবং হাইতি ও নিকারাগুয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছিল।

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নিকটবর্তী ভৌগোলিক অঞ্চল ও ইস্যুতে গভীর আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার সামরিক অভিযানটি এর সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ; তবে এর আগে ছিল ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর শুল্ক চাপানো, বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রার্থী ও দলের পক্ষে সমর্থন, এবং পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার সম্পূর্ণ অংশ যুক্ত করার দাবি।

হোয়াইট হাউজের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম গোলার্ধে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, যা আমাদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির শর্ত। এটি আমাদেরকে আঞ্চলিক প্রয়োজনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে।

নতুন এই আন্তর্জাতিক কৌশলের একটি অংশ হলো বিদেশি শক্তিগুলোর বিশেষত চীনের—আমেরিকার আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করা। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়কে কেন্দ্র করে নেওয়া নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এছাড়া, ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি চুক্তি করানোর আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আরব দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারেও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হলো পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষক, এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে; যারা এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ক্ষয় করতে চায়।

এসব কিছুই ইঙ্গিত করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ভিত্তি যদিও নতুন এক ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত, তবু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মতামত ও আগ্রহই যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক এজেন্ডাকে চালিত করতে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের ইতিহাসে এর পররাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে হস্তক্ষেপ এবং আবার সেখান থেকে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের ভিন্নমাত্রার মিশেল ছিল, আর যা নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এবং জনগণ ও নেতৃত্বের স্বার্থের ওপর।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলাতে দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এসব চক্র বা পরিবর্তন শেষ হয়ে গেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

চীনের ‘মহা পুনর্জাগরণ’

চীনের বৈশ্বিক প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট ‘প্রভাববলয়’ বা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, এমনকি এদের মাঝামাঝিও—বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এখন বেইজিংয়ের উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।

বৈশ্বিক আধিপত্যের লক্ষ্যে চীন তার প্রধান সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতাকে ব্যবহার করেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তৈরি হয় চীনে, যার মধ্যে রয়েছে আমাদের পকেটে থাকা প্রযুক্তিপণ্য, আলমারির পোশাক এবং টিভি দেখতে বসলে যেসব আসবাবপত্র ব্যবহার করি সেগুলোও।

বেইজিং ভবিষ্যতকে নিজের দখলে রাখতে বিশ্বের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজের বৃহত্তম

ক্যাটাগরি