চুয়েটের নতুন ভিসিকে লাল কার্ড শিক্ষার্থীদের, চলছে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাখ্যান করে লাল কার্ড দেখিয়ে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল থেকে নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
একই দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতিও চলছে। শিক্ষার্থীদের শাটডাউন, অবস্থান কর্মসূচি এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার সংলগ্ন সড়ক থেকে লাল কার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিলে যোগ দেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে লাল কার্ড দেখা যায়। মিছিল থেকে ‘অনলাইন ভিসি মানি না’, ‘রেড কার্ড টু অনলাইন ভিসি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান বলেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দায়িত্বে থাকা ৫৬ দিনে শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে চুয়েটকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছেন। নতুন উপাচার্য তাদের আন্দোলনকে ৩০ থেকে ৩৫ জনের আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রতিটি হল থেকে শত শত শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের ওই বক্তব্য এবং অনলাইনে যোগদানের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করছেন বলে জানান সাকিবুর রহমান।
প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের অবস্থান
নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসতে পারেন—এমন খবরের পর শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। রাতভর তারা সেখানে অবস্থান করে ক্যাম্পাসে প্রবেশকারী যানবাহন ও ব্যক্তিদের বিষয়ে নজর রাখেন। শনিবার সকালেও প্রধান ফটকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান অব্যাহত ছিল।
সকালে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও একাডেমিক ভবনের দেয়ালে প্রতিবাদী ও ব্যঙ্গাত্মক গ্রাফিতি আঁকেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া এসব গ্রাফিতিতে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরা হয়।
যেভাবে তীব্র হলো চুয়েটের আন্দোলন
চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে চুয়েটের ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়।
এরপর অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের তৃতীয় দিনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে পরিচয়পত্রসহ স্বাক্ষর করে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবির প্রতি সমর্থন জানান শিক্ষার্থীরা।
চতুর্থ দিনেও শাটডাউনের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে প্রতিবাদী গ্রাফিতি, স্লোগান ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। একই সময়ে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মসূচিও জোরদার হয়।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সর্বাত্মক কর্মবিরতি
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ভার্চুয়াল সভায় জরুরি সেবা ছাড়া ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় চুয়েট শিক্ষক সমিতি। একই দাবিতে কর্মসূচিতে সংহতি জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স ও কর্মচারী সমিতিও।
শিক্ষার্থীদের শাটডাউন, প্রধান ফটকে অবস্থান এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে চুয়েটের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
নতুন ভিসির বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা
এর মধ্যে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে চলমান আন্দোলনকে ‘ক্ষুদ্র’ উল্লেখ করে ক্যাম্পাসে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে তালা খুলে দিয়ে তাকে বরণ করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার নবনিযুক্ত উপাচার্যকে লাল কার্ড দেখানোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুরে বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করেন তারা।
এ ছাড়া আন্দোলনের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে শনিবার বিকেল ৪টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা
শুক্রবার রাতেই নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের কার্যালয় ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এর পর থেকেই নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আগমন নিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শনিবার সকালেও শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। ফলে নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে যোগদান এবং চুয়েটের স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।



