ভারতের সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্র: বাংলাদেশের জন্য যেসব শিক্ষা ও সুযোগ

১৫ আগস্ট ভারত তার ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, নদী, বাণিজ্য এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সম্পর্কের কারণে ভারতের এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশাল বৈচিত্র্যের দেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় ঐক্য
১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হয়, তখন ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং দুর্বল অবকাঠামো ছিল এর নিত্যসঙ্গী।
এত ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে দেশটি কতদিন গণতান্ত্রিক হিসেবে টিকে থাকবে—তা নিয়েও সংশয় ছিল। কিন্তু গত আট দশকে ভারতের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর বজায় রাখা দেশটির একটি অন্যতম শক্তি। বৈচিত্র্য সত্ত্বেও একটি রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ থাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও বড় একটি শিক্ষা। তবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও ভারতের বাস্তবতার অংশ।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর
একসময়ের খাদ্যাভাবের দেশ ভারত আজ কৃষিতে স্বনির্ভর এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, অবকাঠামো ও ডিজিটাল লেনদেনে দেশটি বিশ্বজুড়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
চন্দ্রযান ও মঙ্গলযানের সফল মহাকাশ অভিযান সীমিত বাজেটেও বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জনের এক বড় উদাহরণ। স্বাস্থ্য খাতে ভারতের টিকা উৎপাদন সক্ষমতা আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ সম্মানিত। এত বড় জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল সরকারি সেবা পৌঁছে দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করার কৌশলটি বাংলাদেশের জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ
ভারতের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে পারে। তবে সড়ক, রেল ও নৌপথের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি অবশ্যই দুই দেশের জন্য পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে হতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়লেও কিছু অমীমাংসিত বিষয় দুই দেশের মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি করে—অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ব্যবস্থা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা।
একটি পরিপক্ক সম্পর্কে যেমন পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে, তেমনি মতভেদের জায়গাগুলো সংবেদনশীলতার সঙ্গে সমাধানের তাগিদও থাকতে হয়।
ভবিষ্যতের পথচলা ও আঞ্চলিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তরুণদের মতোই ভারতের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর মূল প্রত্যাশা কেবল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি নয়; বরং দারিদ্র্য, বৈষম্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবন নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ক্ষমতায়ন ও মানসম্মত শিক্ষার মতো একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি উভয় দেশ।
ভারতের মূল শক্তি হলো তার ভিন্নতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা এবং কথা বলার স্বাধীনতা। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র যেমন ভয়হীন সমালোচনা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া চলতে পারে না, তেমনি একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও বৈচিত্র্যময় ভারত পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই ইতিবাচক।
বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে ভারতের ৮০ বছরের অর্জনকে স্বাগত জানায়। আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, স্বচ্ছতা এবং একে অপরের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে।
ভারত তার এই বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পাশাপাশি কতটা সমৃদ্ধ ও শান্তিময় দক্ষিণ এশিয়া তৈরিতে কাজে লাগায়—তার ওপরই দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।




