অপ্রতীম হত্যার রহস্য ঘিরে নানা প্রশ্ন, তদন্তে পাঁচ বাহিনী

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে (১৩) হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ছবি তোলার কথা বলে তাকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে আইফোন ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কিংবা মাদকচক্রের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অপ্রতীম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় সে। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। সন্ধান না পেয়ে ওইদিনই তার বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের পর অপ্রতীমকে উদ্ধারে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। পরে শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক’-এর পেছনের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ছবি তোলার প্রলোভনে পাহাড়ে নেওয়ার অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার অপ্রতীমকে ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায় তুহিন নামের এক কিশোর। সেখানে আনাছ নামের আরেক কিশোরসহ কয়েকজনের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি যাচাই করছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সেখানে একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আগে থেকেই অবস্থান করছিল। অপ্রতীমকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যা করে তার সঙ্গে থাকা আইফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। পরে পাহাড়ের একটি ডালে মরদেহ রেখে তারা পালিয়ে যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ঘটনায় তুহিন নামের এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নাহিদা বেগমকে ঘিরে আগের ঘটনারও খোঁজ
অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কোটবাড়ী গন্ধমতি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এক মাসের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বও পালন করেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মাদক সেবনের অভিযোগে সালমানপুর এলাকার আট কিশোরকে শিক্ষার্থীরা আটক করেছিলেন। পরে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর নাহিদা বেগম তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। ওই ঘটনায় সালমানপুর এলাকার কয়েকজনের নামও আলোচনায় আসে।
এ ঘটনার জেরে কোনো কিশোর গ্যাং বা মাদকচক্র নাহিদা বেগমের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। তবে এ ঘটনার সঙ্গে অপ্রতীম হত্যার সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হয়নি।
একাধিক ইউনিটের তদন্ত
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্লু পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় জড়িত—তা দ্রুত উদঘাটন করা হবে। ঘটনায় যতজন জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশের হেফাজতেও রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
জঙ্গলে যেভাবে মিলল মরদেহ
অপ্রতীমের মরদেহের প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল কাদের জিলানী জানান, শনিবার সকালে তারা ওই এলাকায় বাঁশ কাটতে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি স্থানে কাউকে শুয়ে থাকতে দেখে প্রথমে ঘুমিয়ে আছে বলে মনে হয়েছিল। পরে কাছে গিয়ে মাথায় জখমের চিহ্ন দেখতে পান। এরপর তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে খবর দেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশ, ডিবি ও এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখনো পাওয়া যায়নি।
বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
অপ্রতীম হত্যার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
নিহতের মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘কী কারণে আমার একমাত্র ছেলেকে হত্যা করা হলো আমি জানি না। আমি ঘাতকদের বিচার চাই।’
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এতে কারা জড়িত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে আইফোন ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং নাহিদা বেগমকে ঘিরে অতীতের ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র—সব দিক সামনে রেখেই তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।



