আইএমএফের কঠিন শর্তে নতুন ঋণ নয়, ভিন্ন কৌশলে সরকার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন ও বৈষম্যমূলক শর্ত মেনে নতুন করে আর কোনো ঋণ নেওয়া হবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার অর্থের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার একটি সম্পূর্ণ নতুন ও টেকসই আর্থিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর আইএমএফের প্রধান প্রধান শর্তগুলো কী, কেন এসব শর্ত নিয়ে আপত্তি এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব কী হতে পারে—তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
১. রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও করছাড় কমানোর চাপ
আইএমএফের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে:
- করের আওতা সম্প্রসারণ ও নতুন করদাতা সৃষ্টি।
- কর ফাঁকি রোধ এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর আদায় বাড়ানো।
- অপ্রয়োজনীয় করছাড় বা অব্যাহতি কমানো।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় রাজস্ব সংস্কার জরুরি। তবে হঠাৎ করছাড় কমানো বা ভ্যাটের আওতা বাড়ালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম এবং ব্যবসার পরিচালনা খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ
দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের দুর্বলতা মোকাবিলায় কঠোর তদারকির পরামর্শ দিয়ে থাকে আইএমএফ। তাদের সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:
- ব্যাংকগুলোর সঠিক আর্থিক অবস্থা যাচাই ও তদারকি জোরদার।
- খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
- দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন।
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে এসব সংস্কার অপরিহার্য হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন—দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে যদি সরকারি বা জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হয়, তবে তার সরাসরি বোঝা পড়বে সাধারণ করদাতাদের ওপর।
৩. ডলারের মুক্ত বাজারদর ও বৈদেশিক রিজার্ভ
আইএমএফ চায় ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা।
- সুবিধা: ডলারের কৃত্রিম সংকট কমবে এবং বৈদেশিক লেনদেনে সামঞ্জস্য আসবে।
- ঝুঁকি: স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন ঘটলে আমদানিকৃত জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাবে। ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
৪. বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি হ্রাস
সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার খাতের ভর্তুকিতে। আইএমএফ এসব খাতে ভর্তুকি কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছে।
ভর্তুকি কমালে সরকারের বাজেট ঘাটতি কমলেও সরাসরি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে যাবে। এতে কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
৫. মুদ্রানীতি ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা এবং সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সুদের হার বেশি থাকলে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে, যা নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বাধা সৃষ্টি করে।
সরকারের বিকল্প কৌশল ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা
আইএমএফের ঋণ সাধারণত কঠোর শর্তসাপেক্ষ এবং নিয়মিত পর্যালোচনা (Review) নির্ভর। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী কিস্তি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে ঋণনির্ভরতা কমানোর সরকারি উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করবে:
১. নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সক্ষমতার ওপর।
২. বাজেট ব্যবস্থাপনায় অপচয় কমানোর ওপর।
৩. বিকল্প এবং সুবিধাজনক বিদেশি অর্থায়নের উৎস খোঁজার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের সুশাসন ও সরকারি ব্যয়ে সংস্কার প্রয়োজন। তবে এসব সংস্কারের অর্থনৈতিক চাপ যেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত না পড়ে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।



