আন্তর্জাতিক

জ্বালানির দাম কমাতে রুশ ডিজেল আমদানির ঘোষণা ট্রাম্পের, ক্ষুব্ধ জেলেনস্কি

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করছে ওয়াশিংটন। তবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি ‘উপহার’।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ট্রাম্প জানান, পুতিন অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন। নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া স্বল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তবে অতিরিক্ত এই সরবরাহ রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ রুশ ডিজেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রেখে একটি অস্থায়ী লাইসেন্স জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোতে থাকা রাশিয়ার অন্যান্য সম্পদের ওপর অবরোধ বহাল থাকছে।

জ্বালানির দাম কমানোই ট্রাম্পের লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পেট্রোল ও বিশেষ করে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতি ও ট্রাম্পের জনসমর্থনের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এ দাম সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছিল।

এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়িয়ে জ্বালানির বাজারে চাপ কমাতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে ডিজেলের দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।

সরবরাহের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন

কুইল্টার চেভিওটের বিনিয়োগ কৌশলবিদ টিম আর্মিটেজ মনে করেন, ট্রাম্প ঘোষিত প্রাথমিক চালানের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক ডিজেল ব্যবহারের তুলনায় কম।

তাঁর হিসাবে, প্রথম ধাপে ৩ লাখ টন ডিজেল প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলের সমান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল। ফলে প্রথম চালানের প্রভাব দেশটির জ্বালানির খুচরা দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে না বলে মনে করেন তিনি।

আর্মিটেজের মতে, পরবর্তী চালানগুলো বাস্তবায়িত হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ ছাড়া রাশিয়া ঘোষিত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। দেশটির তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে কী প্রভাব পড়েছে, তা এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেলেনস্কির ক্ষোভ, পুতিনকে ‘উপহার’ বললেন

রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই জ্বালানি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর মতে, রুশ জ্বালানি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা পুতিনকে সুবিধা দেওয়ার শামিল এবং এটি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, পুতিনকে ‘উপহার’ দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়া এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আরও হামলা চালাতে পারে।

জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেনের জনগণের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন প্রয়োজন। রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনকে শক্ত অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

রাশিয়ার বক্তব্য ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে রাশিয়া আগ্রহী। তবে তিনি সরবরাহের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করেননি। রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, ইউক্রেনের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে তারা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে দেশটি।

বিশ্ববাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে

রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকৃত সরবরাহ, বাজারের চাহিদা, পরিবহন ব্যয় এবং চলমান সংঘাতের পরিস্থিতির ওপর।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত সরবরাহ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং তা বাজারে কী পরিমাণ জ্বালানি যোগ করে, সেটিই হবে ট্রাম্পের উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

ক্যাটাগরি