অর্থনীতি

ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু আজ, ১১ হাজার আবেদনে চাওয়া ২ হাজার কোটি টাকা

ছবি: সংগৃহীত

ধুঁকতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর)। ব্যাংকটি থেকে টাকা তুলতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ ধার হিসেবে পাওয়া ৭ হাজার কোটি টাকা থেকে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। তবে এ অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১১টি শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শর্ত অনুযায়ী, এই টাকা দিয়ে নতুন ঋণ দেওয়া বা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত পরিশোধ করা যাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে তিন মাসের জন্য ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। গত মঙ্গলবার এ অর্থায়ন করা হয়। এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন দিতে হবে।

নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ধার করা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্যারান্টির আওতায় সেই দায় পরিশোধ করবে। অর্থ ছাড়ের আগে শর্তগুলো বাস্তবায়নে গত ১২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক।

এর আগে বিশেষ ধার নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পারায় ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। আগের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার প্রভাবে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

এ ছাড়া ব্যাংকটির নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকটিকে বড় অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১ শর্ত

সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ১১টি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

১. গ্যারান্টির আওতায় কোনো দায় অপরিশোধিত থাকলে ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

২. এই অর্থ থেকে ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান পরিচালক এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না।

৩. ব্যাংকের সাবেক বা বর্তমান পরিচালকদের নামে কিংবা বেনামে রাখা আমানত পরিশোধ করা যাবে না।

৪. গ্যারান্টির অর্থ দিয়ে নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ দেওয়া যাবে না। বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানোও নিষিদ্ধ।

৫. আগে অনুমোদিত ঋণসীমার অবিতরণকৃত অংশ বিতরণ করা যাবে না।

৬. ব্যাংকের বিদ্যমান আন্তঃব্যাংক দায় বা প্লেসমেন্টের অর্থ পরিশোধে এই টাকা ব্যবহার করা যাবে না।

৭. অন্য ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ করা যাবে না।

৮. ফোর্সড ঋণ বা এলটিআর সৃষ্টির মাধ্যমে ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনা যাবে না।

৯. এই অর্থ অন্য ব্যাংকে প্লেসমেন্ট বা আমানত হিসেবে রাখা যাবে না।

১০. গ্যারান্টি কার্যকর থাকা অবস্থায় নতুন সংগৃহীত আমানত তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন, নগদ জমার অনুপাত (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণ এবং আমানতকারীদের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে আগের বছরের তুলনায় পরিচালন ব্যয় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। গ্যারান্টির অর্থ থেকে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা যাবে না।

১১. বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো বিভাগ থেকে দেওয়া নির্দেশনাও পরিপালন করতে হবে।

যেভাবে সংকটে পড়ে ন্যাশনাল ব্যাংক

একসময় বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ জয়নুল হক সিকদার পরিবারের হাতে চলে যায়। এরপর এক পরিবার থেকে পাঁচজন পরিচালক নিয়োগ, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর সন্তানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। একপর্যায়ে অন্য একটি ব্যাংকের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরে ২০২৪ সালের মে মাসে সিকদার পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে দেওয়া হয়। একই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে।

দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপে থাকা ব্যাংকটির আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ৭ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে অর্থের ব্যবহার ও পরিশোধ কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্ত মানতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে।

ক্যাটাগরি