বৈরিতা নয়, সংলাপেই সমাধান বাংলাদেশ-ভারতের

কূটনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই। থাকে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক প্রয়োজন এবং আলোচনার সুযোগ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় সোমবারের একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই পুরোনো কূটনৈতিক সত্যটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
কূটনীতিতে কোনো দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ থাকে না। মতপার্থক্য যত গভীরই হোক, আলোচনার পথ খোলা রাখাই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সমস্যা থাকতেই পারে; কিন্তু সেই সমস্যাকে বৈরিতায় পরিণত করলে ক্ষতি হয় উভয় দেশের। বরং সংকট যত বেশি, সংলাপের প্রয়োজনও তত বেশি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সোমবারের সৌজন্য সাক্ষাৎ তাই নিছক আনুষ্ঠানিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে এটিই তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। দুই দেশের সম্পর্কে যখন নানা ইস্যুতে অস্বস্তি, অনাস্থা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে—মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্কের দরজা বন্ধ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গত দুই বছরে কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত টানাপোড়েন বাড়ে। ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা, কূটনৈতিক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি তলব, সীমান্তকেন্দ্রিক বিরোধ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি দুর্বল হয়েছে। দুই দেশের সাধারণ মানুষের যোগাযোগও নানা বাধার মুখে পড়ে।
তবে জনগণের আবেগ ও রাষ্ট্রীয় কূটনীতিকে এক করে দেখলে ভুল হবে। কোনো প্রতিবেশী দেশের জনগণের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ বা অসন্তোষ থাকতেই পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এমন উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীল সরকার সেই আবেগকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক পরিচালনার একমাত্র ভিত্তি করে না। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় তারা যোগাযোগ বজায় রাখে এবং মতপার্থক্যের সমাধান খোঁজে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন ছিল এমনই বাস্তববাদী কূটনীতি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতকে ঘিরে উত্তেজনাকর রাজনৈতিক বক্তব্য ও পারস্পরিক সন্দেহ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্যও দিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করে। তৎকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বক্তব্যও দুই দেশের আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়লেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি ভারতনির্ভরতা কমাতে পেরেছে? বাস্তবতা তা বলে না। ভারত থেকে পণ্য আমদানি অব্যাহত থেকেছে। অথচ ভিসা জটিলতা, সীমান্ত সমস্যা ও বাণিজ্যিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্যে দূরত্ব বাড়লেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে পরস্পরের কাছাকাছিই রেখেছে।
পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য শুধু বিদেশ সফর বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। দেখতে হয়, সেই যোগাযোগ দেশের জন্য কী বাস্তব সুফল বয়ে আনছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্রিয়তা নিয়ে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ভিসা সুবিধা কিংবা বিদেশে বাংলাদেশিদের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি।
রোহিঙ্গা সংকট তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে। অথচ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি।
একইভাবে বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি ও ব্যবসার জন্য বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা সেন্টার ঢাকায় আনার প্রত্যাশাও বাস্তবে বড় কোনো অগ্রগতি দেখেনি। বিভিন্ন দেশের ভিসা নীতিতে কঠোরতা এবং শ্রমবাজারের সংকোচন বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নতুন ভোগান্তি তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ও বাস্তববাদী ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে কিছু ইতিবাচক অর্জন এসেছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থানের উন্নতি এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায় হওয়াটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সফরের পর শ্রমবাজার পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতিকে এখন শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্পর্কের সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় নিয়োগ এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনীতিক নন। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর ঘটনা তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বক্তব্যেও দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ ও যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে তিনি ঢাকায় ভারতের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রমও স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এরই মধ্যে সীমান্তে পুশইন, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো কয়েকটি বিষয়ে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তেজনার মধ্যেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তই কূটনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার উদাহরণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই রয়েছে। কোনো কৃষিপণ্যের সংকট তৈরি হলে প্রতিবেশী দেশ থেকে দ্রুত আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়। সম্প্রতি কাঁচা মরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর ভারত থেকে আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ছোট্ট ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
দুই দেশের সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। নতুন করে এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন। তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে উত্তেজনা নয়, আলোচনাই হতে হবে প্রধান হাতিয়ার।
বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। আবার মতপার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়। একটি পরিণত রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে দৃঢ় থাকে, একই সঙ্গে অন্য দেশের স্বার্থ ও সংবেদনশীলতাও বিবেচনায় নেয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য জরুরি।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডও কোনোভাবেই ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে ভারতের মাটিও যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র না হয়—এ প্রত্যাশা বাংলাদেশের যৌক্তিক অধিকার।
ভারতের কাছেও একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—বাংলাদেশকে ‘বিগ ব্রাদার’ মনোভাব দিয়ে নয়, সমমর্যাদার প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সীমান্ত হত্যা, পুশইন, পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক ভারসাম্য কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি বিষয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে সমাধান খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। এর অর্থ কোনো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, অর্থনীতি ও মানুষের যোগাযোগ দুই দেশকে গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংঘাত নয়, সহযোগিতাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের পথ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক সেই নতুন পথচলার সূচনা হতে পারে। সামনে কঠিন অনেক ইস্যু থাকবে, মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সব বিষয়ে মতৈক্য প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার।
অতীতের তিক্ততা ভুলে বাংলাদেশ ও ভারত যদি পারস্পরিক সম্মান, সমতা, আস্থা এবং জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে যায়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন একটি ইতিবাচক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু তা হতে হবে মর্যাদার সঙ্গে। দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনো বন্ধুত্ব নয়; বরং স্বার্থ রক্ষা করেই পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক—এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশ ফার্স্ট কূটনীতির মূল দর্শন।




