আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারালেই ছাড়তে হবে দেশ, এইচ-১বি কর্মীদের ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড বাতিলের প্রস্তাব

সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারানোর পর নতুন চাকরি বা স্পন্সর খোঁজার জন্য এইচ-১বি ভিসাধারীসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণির বিদেশি দক্ষ কর্মীদের যে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হতো, তা বাতিলের প্রস্তাব করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে চাকরি বা ভিসার যোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে থাকা কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুযোগ আর থাকবে না।

মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) প্রস্তাবিত বিধিটি বৃহস্পতিবার ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। চূড়ান্ত করার আগে দুই মাস সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এইচ-১বি এবং কয়েকটি অন্যান্য কর্মভিত্তিক অস্থায়ী ভিসাধারীরা চাকরি বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থেকে নতুন চাকরি, নতুন স্পন্সর বা স্ট্যাটাস পরিবর্তনের সুযোগ পান। ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই সুবিধার ফলে কর্মীরা নতুন নিয়োগদাতা খোঁজার পাশাপাশি পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রয়োজন হলে বাড়ি বিক্রি, সন্তানদের স্কুল পরিবর্তনসহ ব্যক্তিগত বিষয় গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেতেন।

ডিএইচএসের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই গ্রেস পিরিয়ডের বিধানই বাতিল করা হবে। এতে চাকরি বা ভিসার যোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে থাকা কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৬০ দিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে নতুন নিয়োগদাতা বিদেশ থেকে নতুন করে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মী ভবিষ্যতে আবার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

যেসব ভিসা প্রভাবিত হতে পারে

প্রস্তাবিত পরিবর্তন শুধু এইচ-১বি ভিসাধারীদের জন্য নয়। ডিএইচএসের নথি অনুযায়ী, ই-১, ই-২, ই-৩, এইচ-১বি, এইচ-১বি১, এল-১, ও-১ এবং টিএন শ্রেণির অস্থায়ী কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এতে প্রভাবিত হতে পারেন।

এইচ-১বি ভিসা মূলত বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন এমন পেশায় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রযুক্তি খাত ছাড়াও শিক্ষা, গবেষণা, পরামর্শক ও বিভিন্ন পেশাদারি সেবায় এ ভিসার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ভারত ও চীন থেকে আসা প্রযুক্তি ও পেশাজীবীরা এই কর্মসূচির বড় অংশজুড়ে রয়েছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেলয়েট, পিডব্লিউসি ও আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), ইনফোসিস, এইচসিএল টেক ও এলটিআইমাইন্ডট্রির মতো আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি কর্মীদের বড় নিয়োগদাতা। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাই ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

প্রযুক্তি খাতে বড় প্রভাবের আশঙ্কা

প্রস্তাবিত বিধিটি কার্যকর হলে সিলিকন ভ্যালিসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডিএইচএসও স্বীকার করেছে, পরিবর্তনের ফলে কিছু ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সাময়িক ব্যাঘাত তৈরি হতে পারে। তবে সংস্থাটির যুক্তি, সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে যোগ্য মার্কিন নাগরিকদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে, অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছেন। ইউসি ডেভিস স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল চিন বলেছেন, অনেক এইচ-১বি কর্মী বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তাদের পরিবার ও সামাজিক জীবন সেখানে গড়ে উঠেছে। চাকরি পরিবর্তনের সময় তাদের দ্রুত দেশ ছাড়তে বাধ্য করা অযৌক্তিক বলে তিনি মনে করেন। অভিবাসন সংগঠন এফডব্লিউডি.ইউএসের প্রেসিডেন্ট টড শুল্টেও বলেছেন, এতে কর্মীদের পাশাপাশি তাদের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন ব্যবসা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ও সমস্যায় পড়বে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিবাসন কড়াকড়ি

দ্বিতীয় মেয়াদে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এইচ-১বি কর্মীদের জন্য নতুন বিধিনিষেধ, বাড়তি যাচাই এবং ভিসা-সংক্রান্ত খরচ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে আগস্টে প্রশাসন নতুন এইচ-১বি ভিসার জন্য ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের একটি স্থায়ী ফি আরোপের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবিত ফি আগের কয়েক হাজার ডলারের তুলনায় বহুগুণ বেশি। একই সময়ে এইচ-১বি আবেদন প্রক্রিয়ায় উচ্চ দক্ষতা ও বেশি বেতনের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড বাতিলের নিয়মটি এখনো কার্যকর হয়নি। দুই মাসের জনমত গ্রহণ শেষে ডিএইচএস প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করবে। তাই বর্তমানে চাকরি হারানো এইচ-১বি বা সংশ্লিষ্ট ভিসাধারীদের জন্য বিদ্যমান নিয়মই প্রযোজ্য থাকবে, যতক্ষণ না নতুন বিধি চূড়ান্ত ও কার্যকর হয়।

ফিন্যান্সিয়াল বার্তা/এইচ

ক্যাটাগরি