ইসলামী সমাজে ইমাম ও মুসল্লির সম্পর্ক কেমন হবে

ইসলামী সমাজব্যবস্থায় মসজিদের ভূমিকা অত্যন্ত কেন্দ্রীয়। মসজিদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় ইসলামী সমাজের যাবতীয় কার্যক্রম। তাই ইমামের সঙ্গে মুসল্লিদের সম্পর্ক শিকড়ের সঙ্গে শাখা-প্রশাখা ও পত্র-পল্লবের সম্পর্কের মতো।
একজন আদর্শ ইমাম শিকড় হয়ে মুসল্লিদের ঈমান ও ইসলাম দিয়ে সজীব রাখেন, আর মুসল্লিরাও ইমামকে সম্মান ও মূল্যায়ন করেন। এই পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে এক আদর্শ মুসলিম সমাজ।
মুসল্লিদের প্রতি ইমামের দায়িত্ব ও আচরণ
নবীর উত্তরসূরি হিসেবে সমাজের একজন ইমামের ভূমিকা বহুমুখী। মুসল্লিদের প্রতি তাঁর আচরণ ও দায়িত্বগুলো নিম্নরূপ:
১. মুসল্লিদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়া
ইমামের প্রথম দায়িত্ব হলো মুসল্লিদের দ্বিনদারি ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“আমি নামাজে দাঁড়িয়ে তা দীর্ঘায়িত করব বলে ইচ্ছা করি, অতঃপর শিশুর কান্না শুনতে পেয়ে আমি নামাজ সংক্ষিপ্ত করি এই আশঙ্কায় যে তার মা কষ্ট পাবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৭)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, পরিবেশ ও মুসল্লিদের সুবিধার ওপর ভিত্তি করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হতো।
২. সমাজের যোগ্য শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখা
যেসব অঞ্চলে দ্বিনি শিক্ষার সুযোগ সীমিত, সেখানে একজন ইমামই মূল শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। মানুষকে অন্তত ফরজ পরিমাণ ইলম অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানো ইমামের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ইলম অর্জনে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তিনি আরও বলেছেন, “আল্লাহ আমাকে শিক্ষক ও সহজকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন।” (সহিহ মুসলিম)
৩. সহনশীল ও কোমল হৃদয় হওয়া
নেতা ও শিক্ষক হিসেবে ইমামকে অবশ্যই ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পরত…” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
৪. নিজের চরিত্রকে আদর্শ হিসেবে পেশ করা
সাধারণ মানুষ ইমামদের কর্মকাণ্ডকে শরিয়তের মানদণ্ড মনে করে। তাই ইমামদের কথা ও কাজের মিল থাকা জরুরি। কোরআনে এর কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে:
“হে মুমিনরা! তোমরা যা করো না তা তোমরা কেন বলো? তোমরা যা করো না তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।” (সুরা সাফ, আয়াত: ২-৩)
৫. সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখা
সমাজে বিবাদ মীমাংসা করা ও অসহায়দের সাহায্য করা ইমামের অন্যতম দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ কাজ হলো ‘পরস্পরের মধ্যে সুন্দর মীমাংসা করে দেওয়া’। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯১৯)
ইমামের প্রতি মুসল্লিদের করণীয় ও আচরণ
একটি সুন্দর সমাজ গঠনে ইমামের পাশাপাশি মুসল্লিদেরও বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়:
| দায়িত্ব | মূল বক্তব্য |
| ১. উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন | দ্বিনি নেতা হিসেবে ইমামকে সম্মান করা ও পরামর্শ মেনে চলা মুসল্লিদের ঈমানি দায়িত্ব। (সুরা মুজাদালা, আয়াত: ১১) |
| ২. ভালো ধারণা পোষণ করা | ইমামের প্রতি সুধারণা রাখা শিক্ষা গ্রহণের পূর্বশর্ত। হাদিসে আলেমদের অবজ্ঞা করাকে মোনাফেকির লক্ষণ বলা হয়েছে। |
| ৩. দ্বিনি কল্যাণের মাধ্যম বানানো | জাগতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ইমামদের কাছ থেকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা উচিত। |
| ৪. সৎকাজে সহযোগিতা করা | ইমাম যখন সমাজকল্যাণ বা দ্বিনি কাজের আহ্বান জানান, তখন সাধ্যমতো তাতে অংশ নেওয়া সবার কর্তব্য। |
| ৫. ইমামের জীবনযাত্রার খবর রাখা | আর্থিক অসচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ইমাম স্বকীয়তার কারণে মুখ ফুটে কিছু বলেন না। তাঁদের সম্মানজনক জীবনযাত্রার খেয়াল রাখা মুসল্লিদের দায়িত্ব। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩) |
ইমাম ও মুসল্লির মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত হলেই কেবল একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শ ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।



