স্বাস্থ্য

প্রবীণ স্বজনের জন্য হুইল চেয়ার কেনার আগে যে পাঁচ বিষয় যাচাই করবেন

ছবি: সংগৃহীত

বয়স বাড়লে হাঁটাচলা কমে আসে। হাঁটুর ব্যথা, স্ট্রোক কিংবা দীর্ঘ অসুস্থতার পর অনেক পরিবারেই বাবা, মা বা দাদা, দাদির জন্য হুইল চেয়ারের কথা ওঠে। দোকানে গিয়ে বা অনলাইনে দেখে চেয়ার কিনে ফেলা কঠিন নয়। কঠিন হলো ঠিক চেয়ারটি বাছা। ঘরে এনে দেখা যেতে পারে, চেয়ার বাথরুমের দরজা দিয়ে ঢুকছে না, কিংবা রোগীর হাতে চাকা ঘোরানোর জোর নেই। বাংলাদেশের বাজারে হুইল চেয়ারের দাম শুরু হয় ৬,৯০০ টাকা থেকে। ধরন আর মডেলভেদে এটি ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। কেনার আগে নিচের পাঁচটি বিষয় মিলিয়ে নিলে ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে।

১. আগে ঠিক করুন কোন ধরনের চেয়ার লাগবে

সব হুইল চেয়ার একরকম নয়। রোগীর সমস্যা বুঝে ধরন বাছতে হয়।

ম্যানুয়াল হুইল চেয়ার হাসপাতাল ও ঘরে সবচেয়ে বেশি চলে। রোগীর হাতে যথেষ্ট জোর থাকলে তিনি নিজেই চাকা ঘুরিয়ে চলতে পারেন, নইলে অন্য কেউ ঠেলে নেন। কাজ শেষে ভাঁজ করে রাখা যায়। দাম ৬,৯০০ থেকে ৮,৫০০ টাকা।

কমোড হুইল চেয়ার তাঁদের জন্য, যাঁরা টয়লেটে যেতে পারেন না। একই চেয়ারে বসে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া যায়, আবার টয়লেটের কাজও সারা যায়। দাম ৯,০০০ থেকে ১৫,৫০০ টাকা।

স্লিপিং হুইল চেয়ারের পিঠ পেছনে হেলানো যায়। দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বা বেশি বসে থাকতে হলে এটি কাজে আসে। দাম ১৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকা। দীর্ঘক্ষণ বসার চাপ কমাতে কোন মডেল ঠিক হবে, তা চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে কথা বলে ঠিক করুন।

ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার তাঁদের জন্য, যাঁদের হাতে জোর কম। এক হাতে সুইচ বা জয়স্টিক চালিয়ে একা চলা যায়। দাম ৭০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ টাকা। কেনার পর কন্ট্রোল চালানো শিখে নিতে হয়।

মাত্র কয়েক দিনের জন্য দরকার হলে দৈনিক ভাড়ায়ও হুইল চেয়ার পাওয়া যায়। নতুন কেনার আগে ভাড়ার খরচটাও হিসাব করে দেখা ভালো।

২. মাপ, ওজন সহনক্ষমতা ও ফ্রেম মিলিয়ে নিন

সিটের প্রস্থ রোগীর কোমরের মাপের সাথে মেলাতে হবে। খুব আঁটসাঁট বা খুব ঢিলা সিট দুটোই অস্বস্তির। ওজন সহনক্ষমতা রোগীর ওজনের চেয়ে বেশি রাখুন। মডেলভেদে এই সীমা আলাদা। যেমন একটি স্ট্যান্ডার্ড ম্যানুয়াল ফোল্ডিং মডেলে ১৮০ কেজি লেখা আছে, আবার একটি কমোড মডেলে ১০০ কেজি পর্যন্ত। তাই বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে নয়, স্পেক পড়ে কিনুন।

ফ্রেম সাধারণত স্টিলের হয়। ক্রোম প্লেটেড স্টিল মজবুত, তবে ভিজে থাকলে মরচে ধরতে পারে। বর্ষার মৌসুমে এটি মাথায় রাখা দরকার।

৩. বাসার দরজা, বাথরুম আর রাস্তা মেপে দেখুন

এটি সবচেয়ে বেশি ভুল হয় এমন জায়গা। চেয়ার কেনার আগে দরজার প্রস্থ মাপুন। শুধু সিটের প্রস্থ ধরলে হবে না, হাতল আর চাকাসহ চেয়ারের পুরো প্রস্থ দেখতে হবে। কমোড চেয়ার কিনলে বাথরুমের দরজা দিয়ে সেটি ঢুকবে কি না, আগেই নিশ্চিত হোন।

ঘরের বাইরের রাস্তাও হিসাবে রাখুন। সলিড টায়ারে পাংচারের ঝামেলা নেই, তবে ঝাঁকুনি বেশি লাগে। বাতাসের টায়ার নরম চলে, কিন্তু পাংচার হতে পারে। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় বড় পেছনের চাকার মডেলে চলতে সুবিধা।

৪. চাকা, ব্রেক, ভাঁজ আর ব্যাটারি পরীক্ষা করুন

সম্ভব হলে নিজে গিয়ে চেয়ারে বসে দেখুন। ব্রেক ধরছে কি না, চাকা ঠিকমতো ঘুরছে কি না, ভাঁজের লক শক্ত কি না, সব পরীক্ষা করে নিন। সিএনজি বা গাড়িতে ওঠানামার দরকার হলে ভাঁজ করা চেয়ার কতটা জায়গা নেয়, তাও দেখুন।

ইলেকট্রিক চেয়ারে প্রশ্ন বেশি। ব্যাটারির ধরন কী, এক চার্জে কতদূর চলে, চার্জ হতে কত সময় লাগে, এগুলো বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন। অনেক সময় লিস্টিংয়েই এসব তথ্য থাকে না, তখন ফোনে জেনে নিতে হবে। লোডশেডিংয়ের দেশে আরও দুটি প্রশ্ন জরুরি: বিদ্যুৎ না থাকলে চেয়ার ঠেলে নেওয়া যায় কি না, আর পুরোনো ব্যাটারি বদলাতে কত খরচ।

৫. বিক্রেতা, দাম, ওয়ারেন্টি ও যন্ত্রাংশের খোঁজ নিন

দাম বিক্রেতা আর মডেলভেদে বদলায়। তাই একজনের কথায় না থেকে কয়েকজনের দাম মিলিয়ে দেখুন। দাম ও স্পেক পাশাপাশি দেখতে চাইলে বিডিস্টলে ম্যানুয়াল, ফোল্ডিং, কমোড ও ইলেকট্রিক মডেলের তালিকা আছে। সেখান থেকে পছন্দের মডেল বেছে বিক্রেতার সাথে সরাসরি কথা বলে নেওয়া যায়।

অর্ডারের আগে ওয়ারেন্টির শর্ত জেনে নিন। ইলেকট্রিক চেয়ারে মোটর, কন্ট্রোলার, ব্যাটারি ও চার্জারের ওয়ারেন্টি আলাদা কি না, তা জিজ্ঞেস করুন। টায়ার, টিউব, ব্রেক বা ফুটরেস্টের মতো যন্ত্রাংশ পরে পাওয়া যাবে কি না এবং মেরামতের জন্য কোথায় যেতে হবে, সেটিও জানা দরকার। ঢাকার বাইরে থেকে আনালে ডেলিভারি চার্জ ও সময় আগে ঠিক করুন। চেয়ার হাতে পেয়ে প্যাকেট খুলে ব্রেক, চাকা ও ভাঁজ পরীক্ষা করুন, আর ক্যাশ মেমো ও ওয়ারেন্টির শর্ত লিখিত নিন।

হুইল চেয়ার রোগীর চলাফেরার সঙ্গী, তাই কেনার সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া না করাই ভালো। রোগীর অবস্থা বুঝে কোন চেয়ার ঠিক হবে, তা চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে কথা বলে ঠিক করুন।

ফিনান্সিয়াল বার্তা/ বি ইউ

ক্যাটাগরি