পররাষ্ট্রনীতি কি ব্যক্তির ইচ্ছায়, নাকি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে?

পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং আবেগতাড়িত বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন রাজনীতিক তাঁর অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন, একজন কূটনীতিক কঠোর ভাষায় জাতীয় স্বার্থের কথা বলতে পারেন, এমনকি একজন মন্ত্রীও কোনো বিষয়ে আপসহীন থাকতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার আগেই কোনো প্রতিমন্ত্রী যদি এমনভাবে বক্তব্য দেন, যাতে সেটিকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি ব্যক্তির বক্তব্যই সেখানে নীতির প্রতিফলন হয়ে উঠছে?
হুমায়ুন কবিরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় তিনি যুক্তরাজ্যে ছিলেন এবং যুক্তরাজ্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তাঁর প্রোফাইল অনুযায়ী, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস, বরিস জনসন ও ঋষি সুনাকের আমলে তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে নীতি প্রণয়ন, কৌশলগত সমন্বয় ও সরকারি বিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া লুইশামের মেয়রের কার্যালয়ে ক্যাবিনেট এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন হুমায়ুন কবির। ওই সময়ে ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কার্যক্রম, প্রশাসনিক সমন্বয়, অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। মেয়র অব লন্ডন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিতেও তিনি স্ট্র্যাটেজি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে কৌশলগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং নীতি বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নীতিনির্ধারণের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা যে সমৃদ্ধ, তা বলাই যায়। তবে অভিজ্ঞতা যত বড়ই হোক, কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের সীমার বাইরে রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলার স্বয়ংক্রিয় অধিকার দেয় না।
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়েও যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেটি খুব জটিল কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ সরকারে যোগ দেওয়ার আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না। বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়ে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, সে কারণে প্রশ্নটি একেবারেই অমূলক নয়।
এটি মূলত একটি নথিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করলেই এর সহজ সমাধান সম্ভব ছিল। কিন্তু সাংবাদিকরা যখন এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তখন হুমায়ুন কবির জানতে চান কোন সংবাদপত্র বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মঈন উদ্দিন আহমদ-ফখরুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন! মানে কোন নেটিজেন? আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, কাজ করি। আপনি বলেন নেটিজেন! তো মানে কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে মানে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার নাকি?’
সরকারের কোনো পদে থাকা ব্যক্তি তাঁর পদমর্যাদার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করতেই পারেন। কিন্তু বৈধ, প্রাসঙ্গিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাংবাদিকদের কাজ সরকারের প্রশংসা করা বা মন্ত্রীদের সন্তুষ্ট রাখা নয়। তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা—এবং প্রয়োজন হলে সেই প্রশ্ন অস্বস্তিকরও হতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের কাছে জবাবদিহি চাওয়াই সাংবাদিকতার স্বাভাবিক ভূমিকা।
হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে বিতর্কটি শুধু তাঁর বক্তব্যের ধরন নিয়েই নয়; তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত পররাষ্ট্রনীতির দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। কূটনীতি কোনো টেলিভিশন টক শো নয়, যেখানে প্রতিটি মতপার্থক্যকে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধে রূপ দিতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বক্তব্যের প্রতিটি শব্দের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তাই অন্য দেশের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযম, কৌশল এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
এখানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একটি পক্ষের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি এতে রয়েছে। ফলে এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্যবস্থা।
হুমায়ুন কবির বলেছেন, বাংলাদেশ ওই চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখানেই মূল পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ সরকার যদি চুক্তিটির অংশ হওয়ার সম্ভাবনা যাচাই বা এ বিষয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে সেটি স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। আলোচনা যদি কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, সেটিও জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন। আর হুমায়ুন কবির যদি সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে নিজের মূল্যায়ন বা আগ্রহের কথা বলে থাকেন, তাহলে সরকারকেও দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাতে হবে যে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য, নাকি রাষ্ট্রীয় অবস্থান।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় কৌশলগত জোটে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলালে নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো পররাষ্ট্রনীতি চিরস্থায়ী নয়।
সরকার যদি মনে করে বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতা নতুন কোনো কৌশলগত অবস্থান গ্রহণের দাবি রাখে, তাহলে সেই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার পূর্ণ অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা, পর্যালোচনা ও নীতিনির্ধারণের মধ্য দিয়েই আসা উচিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। একইভাবে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার অধিকারও বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে পররাষ্ট্রনীতি বা বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত বক্তব্য শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই আস্থা রক্ষার জন্য বক্তব্যের সংবেদনশীলতাও জরুরি। দৃঢ় কূটনীতির জন্য উচ্চকণ্ঠ হওয়া প্রয়োজন নেই। বরং কার্যকর কূটনীতির বড় শক্তি হলো—কম বলা, কিন্তু কৌশলগতভাবে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করা এবং বাস্তব অর্জন নিশ্চিত করা।
তাই হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত কেবল একজন প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রশ্ন। তিনি কি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন? করে থাকলে তার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথি কি প্রকাশ করা সম্ভব? মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কি সরকারের সিদ্ধান্ত, নাকি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন? নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁর মন্তব্য কি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া, নাকি কোনো সরকারি অবস্থানের প্রতিফলন?
এসব প্রশ্নকে বিদ্বেষপূর্ণ বা ষড়যন্ত্রমূলক প্রশ্ন হিসেবে দেখার কারণ নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে এ ধরনের প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। বরং প্রশ্নের স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক উত্তরই বিতর্কের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
একটি ধারণা অনেক সময় সামনে আসে—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী যত জোরালো ও কঠোর ভাষায় কথা বলবেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গুরুত্বও তত বাড়বে। বাস্তবতা বরং ভিন্ন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বক্তব্যের শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়; তার পেছনে থাকা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, কৌশল, ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও বাস্তব সক্ষমতায়।
সুতরাং বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, পররাষ্ট্রনীতি কোনো ব্যক্তির আবেগ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে না। কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা কিংবা রাষ্ট্রীয় কৌশল নিয়ে কথা বলবেন, তখন তাঁর বক্তব্য যেন স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের সরকারের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। আর যদি সেটি ব্যক্তিগত মতামত হয়, সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো দরকার। কারণ পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত আবেগে নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।



