জাতীয়

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা: লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন ও অর্থনীতি

ছবি- সংগৃহীত

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আবারও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা এবং কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।

গ্যাস সংকটের ধাক্কা বিদ্যুৎ উৎপাদনে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংকটে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের স্বাভাবিক গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি ইতোমধ্যে দৈনিক ১,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহের এই ঘাটতি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আঘাত করেছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল-সংক্রান্ত সমস্যাও সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায় এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ছে

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে লোডশেডিংয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

পরিস্থিতি শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে। দেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

শুধু গ্যাস নয়, কয়লা ও তরল জ্বালানিতেও চাপ

বর্তমান সংকটের পেছনে কেবল গ্যাসের ঘাটতিই দায়ী নয়। কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যাও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকটটি একক কোনো সমস্যার ফল নয়; বরং গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে।

শিল্প ও ব্যবসায় বাড়ছে ক্ষতির আশঙ্কা

লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প ও উৎপাদন খাত। বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এই সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার তথ্যও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠান যেখানে জেনারেটর বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে পারে, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।

জনজীবনে দুর্ভোগ

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবাতেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিছু হাসপাতালে নেবুলাইজার, এক্স-রে, ইসিজি ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও অস্ত্রোপচারের সময় জেনারেটরের সাহায্য নিতে হয়েছে।

কেন বারবার জ্বালানি সংকট?

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, এলএনজি আমদানির ধারাবাহিকতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো সমস্যার প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থায় পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় শুধু জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

উত্তরণের পথ কোথায়?

বর্তমান সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ—

প্রথমত, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সরবরাহ পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সংকটের সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বড় কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে না যায়।

পঞ্চমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

সামনে যে প্রশ্ন

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে—শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের লোডশেডিং তাই কেবল বিদ্যুৎ না থাকার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িত শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যবসার খরচ, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা যেমন ঝুঁকির মুখে থাকবে, তেমনি অর্থনীতির গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এখনই প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি কৌশল।

ফিন্যান্সিয়াল বার্তা/এইচ

ক্যাটাগরি