বাস থেকে নেমে কোথায় গিয়েছিল তাজমিন, তিন ঘণ্টার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) হত্যার ঘটনায় নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লায় ফেরার পর পদুয়ার বাজারে নামা থেকে শুরু করে মরদেহ উদ্ধারের আগের সময়টুকুতে কোথায় ছিল সে, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশের হাতে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজারে হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে তাজমিন। এরপর তাকে আশপাশের কয়েকটি দোকানের দিকে যেতে এবং একটি দোকানির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছু একটা দেখায় বা দিকনির্দেশনা দেয়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর তার চলাচলের বিষয়ে এখনো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি, রাত সাড়ে ৩টার দিকে ধানক্ষেতে তাজমিনকে হত্যা করা হয়। ফলে রাত সোয়া ১২টার পর থেকে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা সে কোথায় ছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সিসিটিভি, মোবাইলের অবস্থান ও অটোরিকশা নিয়ে তদন্ত
পদুয়ার বাজার থেকে বের হওয়ার পর তাজমিন কোন পথে গিয়েছিল, কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল এবং ওই সময় কারও সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। অটোরিকশাটির সঙ্গে তাজমিনের যাতায়াতের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গতিবিধি, অটোরিকশার অবস্থান কিংবা অন্য কোনো আলামত থেকে এখনো হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে অটোরিকশা
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় ছিল। কাছেই পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, অটোরিকশা থেকে ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান তিনি। আশপাশের ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির মতো চিহ্ন দেখে এগিয়ে গিয়ে একটি ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মরদেহটির মাথা কাদায় গোঁজা ছিল এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল বলে জানান তিনি।
মৃত্যুর আগে বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন
নিহত তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয় তার মেয়ে। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয় তাজমিন।
আবদুল আলীম বলেন, রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করলেও সে ফোন ধরেনি। বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ে তাকে মোবাইল ফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। বার্তায় তাকে গিয়ে নিয়ে আসতে বলে তাজমিন।
বাবার ভাষ্য, তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন।
মেয়ের পাঠানো লাইভ লোকেশন, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছিল কয়েক মাস আগে
তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ মজুমদার জানান, অজ্ঞাত কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সে আর স্কুলে আসেনি।
তার গৃহশিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখাশোনাও করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন।
হত্যা মামলা, গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাজমিনের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এ মামলায় অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তাজমিন বাস থেকে নামার পর কোথায় গিয়েছিল, রাত পৌনে ২টার দিকে বাবাকে পাঠানো লাইভ লোকেশনের সঙ্গে তার শেষ গতিবিধির কী সম্পর্ক এবং ধানক্ষেতে কীভাবে তার মৃত্যু হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা ও দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।



